Friday, November 1, 2019

Alif of arabic calligraphy : the miracle of beauty

ক্যালিগ্রাফির আলিফ : রহস্যময় সৌন্দর্যের আকর


শৈশবে ক্যালিগ্রাফিতে আকৃষ্ট হওয়ার যতগুলো কারন ছিল, ক্যালিগ্রাফির আলিফ হরফটি তার মধ্যে অন্যতম। মকতবে সুর করে পড়া হত- আ আ আ ইন ইন্নাল্লাহ আ ইন, আ ইন মিনাল উ ই আ, আ লেমান আ ই উ.. এরপর আনামিলা আনাসিয়া আ-লিফুল আ- লাইয়া, আনিবুয়া আলিবুরা আ-লাতুন আখিইয়া...
উস্তাদজি খুব সুন্দর করে মোটা পুষ্ট বলিষ্ঠ একহাত লম্বা একটা আলিফ বোর্ডে লিখতেন আর আমরা হেলে দুলে সুর করে পড়তাম.. আনামিলা.. আনাসিয়া..
সেটা একটা ঘোরের মত আমাদের আবিষ্ট করতো আর আলিফ হরফটির প্রতি মমতা ভালবাসা গাঢ় হতো। এখন মকতবে এমন করে পড়ায় কি না জানি না।
যখন মাদরাসায় খোশখত হুজুরের কাছে আলিফ লেখার তালিম নিতে শুরু করলাম, তিনি কলমের সাথে আলিফের শেকলি মেসাল দেখিয়ে বললেন, কলম গুইয়াদ কেমান শাহে জাহা নম, কলম কেসরা বদৌলত মিরসা নম।
আহা! কী গভীর গহীন কথা!! এক ভিন্ন জগতে পা রাখা শুরু হলো। আরো জানলাম- কুল্লু ইলমিন মিনাল আলিফ ওয়াল আলিফু মিন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা!
-খুজিল খত্ত বি হুসনিল আলিফ।
সুতরাং আলিফকে সুন্দর করে লেখা শুরু হল।
এরপর উস্তাদ মুহতারম শহীদুল্লাহ ফজলুল বারী রহ. আলিফ দরস দেয়ার সময় বললেন- আল খত্তু হানদাসাতুন রুহানিয়াহ, কয়ইদুহু বি আলাতিন জিসমানিয়াহ। ব্যস, আধ্যাত্মিকতার এক রহস্যময় জগতে আলিফের চর্চা শুরু হল। খাতার পর খাতা দিস্তার পর দিস্তা শুধু আলিফ লিখেই ফুরিয়ে গেল, কিন্তু তৃষ্ণা মেটে না।
যত বড় ক্যালিগ্রাফার তাঁর আলিফটি তত রহস্যময়। হজরত আলী রা. থেকে ওস্তাদ বাগদাদী পর্যন্ত সবাই আলিফ হরফকে সবিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। ক্যালিগ্রাফির জনক ইবনে মুকলা(মৃ. ৯৪০ই.) আলিফকে সকল হরফের মূল ভিত্তি করে আবিস্কার করলেন "আল-খত আল-মানসুব"। সেখান থেকে ক্যালিগ্রাফির বুনিয়াদী শিক্ষায় অত্যাবশ্যকীয় পাঠ্যসূচিতে "মিজান আল-খত" যুক্ত হল।
সুতরাং একজন ক্যালিগ্রাফারের জীবনে আলিফ হরফ সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে। ক্যালিগ্রাফির সমস্ত আধ্যাত্মিকতা যে আলিফ হরফকে বেষ্টন করে আছে তা বিখ্যাত ফার্সি কবি মওলানা রুমীর আধ্যাত্মিক উস্তাদ শামস তাবরেজির(মৃ. ১২৪৮ ই.) উক্তিতে পাওয়া যায়। তিনি বলেন, সমস্ত রহস্য আলিফ হরফকে ঘিরে, আর অন্যসব হরফকে সৃষ্টি করা হয়েছে আলিফকে ব্যাখ্যা করার জন্য, তবু আলিফের রহস্য ভেদ করা সম্ভব হয় নাই।
ছবি- বিভিন্ন ক্যালিগ্রাফারের করা আলিফ হরফ।























Saturday, October 19, 2019

Calligraphy and Spirituality



ক্যালিগ্রাফি ও আধ্যাত্মিকতা


একদিন মাগরিবের পর একাকি বাসায় জানালা দিয়ে আকাশ দেখছি। বিদ্যুত নেই। চারদিক সুনসান। আকাশে ধুসর অন্ধকার গাঢ় হয়ে আসছে। সেখানে আবাবিল আর চামচিকের ঝাঁকেরা তাদের সান্ধ্য আহারে ব্যস্ত। আমি দেখছি তাদের প্রাণোচ্ছল ওড়াউড়ি। কী সুন্দর ! বাতাসে ভেসে হেলেদুলে চলছে আর গোত্তা খেয়ে বাক নিয়ে ফিরে আসছে। তা দেখে শৈশবের ঘুড়ি উড়াবার কথা, বর্ষার নতুন পানিতে খলসে মাছের খলবল সাঁতারের ছবি মনে ভেসে উঠে। কখন যে এশা ঘনিয়ে আসলো টের পাইনি। মহল্লার মিনার থেকে আযান শুনে ঘোর কেটে যায়।
এশার নামাযে সুরা ইউসুফের বয়ানের সুরে তেলাওয়াত যেন ক্যানভাসের রঙিন জমিনে হরফের দোলায়িত ছন্দ হয়ে ভেসে ওঠে মনের গহীনে।
২০০৯ সালে তেহরানের ক্যালিগ্রাফি মিউজিয়ামে গিয়ে এমনই হারিয়ে গিয়েছিলাম ক্যালিগ্রাফির ভূবনে। রঙ আর রেখা যেন আকাশের বিশাল জমিনে পাখিদের উচ্ছল উড়াওড়ি। এই যে অনুভব ক্যালিগ্রাফিতে আমাদেরকে মগ্ন করে, তেপান্তরের দূর সীমানায় মন ছুটে যায়, নিজের ভেতরে নিজেকে খুঁজে ফেরা কী দিয়ে বুঝানো যায় !!


ছবি- নেট থেকে নেয়া ইরানী ক্যালিগ্রাফি।








Monday, October 14, 2019

Tasweed : Daily practice of a Calligraphist


ক্যালিগ্রাফির তাসউইদ : ক্যালিগ্রাফারের আমলনামা

গত শতকের নব্বই দশকের কথা। ওস্তাদ শহীদুল্লাহ ফজলুল বারী রহ. তখন বায়তুল মোকাররম মসজিদের উত্তর গেটের বিপরীত পাশের ভবনে দারুল ফুনুন নামক অনুবাদ ও আরবি লেখালেখির প্রতিষ্ঠানে বিকেলে বসতেন। প্রতিষ্ঠানটি উনার নিজের। সেখানে প্রায় প্রতিদিন খত শিখতে যেতাম। আর ফজর বাদ কুরআন তেলাওয়াত করে ঘন্টা দেড়েক মগবাজারের মেসে বসে হরফ মশক করতাম। এভাবে খাতার পর খাতা হরফে ভরে যেত। তখন থেকে ক্যালিগ্রাফি বিষয়ক বইপত্র সংগ্রহ করা শুরু করলাম। একদিন এরকম একটি খতের কিতাবে মশক বিষয়ক লেখা পেলাম। তখন জানতে পারলাম, মশক করা কাগজকে তাসউইদ বলে। পরে তুরস্কের বইপত্রেও এটা দেখলাম। সেখানে একে বলে কারালামা। এর অর্থ- কালি দিয়ে কাগজ পূর্ণ করা বা ক্যালিগ্রাফারের মশক করা কাগজ।
পৃথিবীর সব ক্যালিগ্রাফার এটা প্রতিদিন করে থাকেন এবং এতে নাম ও তারিখ লিখে থাকেন, আর এগুলো সংরক্ষন করেন। ফলে পরে পুরনো মশক দেখে বুঝা যায় লেখার কতটা অগ্রগতি হল।
ছবি- আমার মশক করা একটি তাসউইদ পাতা










Who is the inventor of Diwani calligraphy style ?




খত্ দিওয়ানীর আবিস্কারক কে??

খত্ত দিওয়ানী ১৪ শতকের শেষ দিকে তুরস্কে ওসমানী খেলাফত প্রতিষ্ঠার পর রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে। প্রাথমিক ভাবে এটা ১২ শতকের রিকা খত্ত থেকে ১৪ শতকে সুলাইমান-১ এর আমলে ”হাওছাম রুমি” উদ্ভাবন করেন। তবে সরকারিভাবে এর আবিস্কারক হিসেবে ইবরাহীম মুনিফ (১৪৫৬ ই.) স্বীকৃত।
এটা তুরস্কের ওসমানী খেলাফতের সরকারী লিপি ছিল।

কুইজের জন্য উত্তর লিখবেন- ইব্রাহীম মুনিফ (৮৫৭ হি/১৪৫৬ই.), তুরস্ক।

ছবি- আমার করা দিওয়ানী ক্যালিগ্রাফি। ১৪৪১ হি. ।

দিওয়ানী ক্যালিগ্রাফি, ১৪৪১

Making Calligraphy : step by step

ক্যালিগ্রাফির ধাপগুলো 

আমরা ক্যালিগ্রাফি কলমে যখন একটি কাজ করার চিন্তা করি তখন কিছু বিষয় ভেবেচিন্তে ঠিক করে নিতে হয়।
এক. কোন আয়াত বা সুরা অথবা কথা দিয়ে ক্যালিগ্রাফি হবে।
দুই. নির্দিষ্ট টেক্সট এর ভেতর কোন সিমেট্রিকাল ফিচার আছে কি না। এমন কোন বিশেষ ব্যাপার যা ক্যালিগ্রাফিতে চোখ শীতল ও হৃদয় তৃপ্ত হবে।

তিন. কোন শৈলী এবং এর শেইপ কেমন হবে।৷ দিওয়ানী না কি সুলুস হবে। দায়রা না কি বায়দা শেইপ হবে।
চার. কলম তৈরি করা। প্রতিটি ইউনিক ক্যালিগ্রাফির সাইজ-শেইপ ও শৈলির জন্য কলম বানাতে হয়। হরফের পুরুত্ব এবং কম্পোজিশন অনুযায়ী কলমকে কেটে নিতে হয়।
পাঁচ. পেন্সিল দিয়ে লেআউট করতে হয়। কুরআনের আয়াত/ সুরা যাই হোক না কেন, কাগজে লিখে ফিচারগুলো চক আউট করতে হয়।
ছয়. ক্যালগ্রাফি কলমে লেআউটটি বার বার মশক করতে হয়।
সাত. ফাইনাল ক্যালিগ্রাফি করার পর তাশকিলাত ও তাঝয়িনাত প্রয়োগ করতে হয়।

আসুন আমরা মনের মত ক্যালিগ্রাফি করি।  
ছবি- সুরা নাস। বিখ্যাত শামসি কম্পোজিশনে, দায়রা শেইপে, বাহরি আল বাঙালা শৈলিতে করা। প্রস্ফুটিত ফুলের আকৃতি অনুভব হয়।






Name Calligraphy of Bangladesh



আরবি ক্যালিগ্রাফিতে
নামলিপি

ক্যালিগ্রাফি চর্চায় বিভিন্ন সময়ে নানান পেশার লোকের নাম সুন্দর করে লিখে দিতে হয়।  কখনও ক্লায়েন্ট আবদার করেন , আবার কখনও বন্ধু, হিতাকাংখিদের নাম লিখতে ইচ্ছে হয়। নামলিপি ক্যালিগ্রাফিতে একটি জনপ্রিয় বিষয় হয়ে আছে।
এখানে আমার করা কয়েকটি নামলিপি দেয়া হলো।


নামলিপি : মুহাম্মদ আবদুর রশীদ। (আমার প্রিয় আব্বাজান রহ.)। দিওয়ানী শৈলী. ২০১৯

নামলিপি : ইবরাহীম মন্ডল
বাংলাদেশে ক্যালিগ্রাফি আন্দোলন গত শতকের ৯০ দশকে যার হাত দিয়ে শুরু হয়, তিনি আমাদের শ্রদ্ধেয় শিল্পী ইবরাহীম মন্ডল। দশটি জাতীয় ক্যালিগ্রাফি প্রদর্শনীর আহবায়ক ছিলেন তিনি। বাংলাদেশে ক্যালিগ্রাফি চর্চা ও প্রসারে যিনি নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। তার ঋণ আসলে শোধ হবার নয়। আজকের নামলিপিটি তাকে উৎসর্গ করলাম। আল্লাহপাক উনাকে নেক হায়াত ও উত্তম প্রতিদান প্রদান করুন।
ছবি- ইবরাহীম মন্ডল, জালি দিওয়ানী শৈলিতে। তারকিবটি একজন বিখ্যাত উস্তাদের কাজের ছায়া অবলম্বনে। এ মূহুর্তে উনার নামটি মনে পড়ছে না।


নামলিপি : ইবরাহীম মন্ডল, দিওয়ানী শৈলী, ২০১৯

নামলিপি : আরিফুর রহমান
অনেকদিন ধরে ভাবছিলাম, আমাদের ক্যালিগ্রাফি অঙ্গনে যারা অবদান রেখে চলেছেন, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন কিভাবে করতে পারি। আর কিছু না পারি, শিল্পীর নামটা তো সুন্দর করে লিখতে পারি!
আরিফুর রহমান আমাদের মুরব্বি ক্যালিগ্রাফি শিল্পীদের অন্যতম। তিনি বিভিন্ন ভাবে ক্যালিগ্রাফির উন্নয়নে কাজ করে চলেছেন। আমি তার প্রতি বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ, তিনি আমার জন্য সুদূর তুরস্ক থেকে ক্যাটালগ, কালি এনেছেন। বিশেষ করে ৪১জন বিখ্যাত তুর্কি উস্তাদগণের ক্যাটালগটি বিরল সংগ্রহ। আমাদের আর্কাইভ এই ক্যাটালগটি পেয়ে সমৃদ্ধ হয়েছে। শিল্পীকে আন্তরিক মোবারকবাদ ও ধন্যবাদ জানাই। আল্লাহ পাক তাকে নেক হায়াত ও জাঝা খায়ের দান করুন।
ছবি-  নামলিপি - আরিফুর রহমান, জালি দিওয়ানিতে উস্তাদ আবদুল নাসেরের দায়েরা তারকিব অনুসারে।


নামলিপি : আরিফুর রহমান, দিওয়ানী শৈলী, ২০১৯


নামলিপি : তাহিরা জেরিন ও রেজাউল ইসলাম
আমার ক্লায়েন্ট। তারা নতুন সংসার শুরু করেছেন। তুগরা শৈলিতে তাদের নাম লিপি করা হয়েছে।

নামলিপি : তাহিরা জেরিন, তুগরা শৈলি, ২০১৯, আলা তরিকতি উস্তাদ বহর।



নামলিপি : রেজাউল ইসলাম, তুগরা শৈলি, ২০১৯, আলা তরিকতি উস্তাদ বহর।

নামলিপি : মোহাম্মদ আবদুর রশীদ রহ.। তুগরা শৈলি, ২০১৯

নামলিপি মশক

Who is the father of Arabic Calligraphy



আরবি ক্যালিগ্রাফির জনক কে?


আমরা প্রায়ই একটা প্রশ্নের সম্মুখীন হই। সেটা হলো—কার মাধ্যমে ক্যালিগ্রাফির মূল যাত্রা শুরু হয়েছে? তিনি হলেন—আবু আলী মুহাম্মদ ইবনে আলী ইবনে আল-হুসাইন ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে মুকলা আল-বাগদাদী।  সংক্ষেপে ইবনে মুকলা নামে তিনি প্রসিদ্ধ। তাঁর মায়ের নাম ছিল মুকলাহ। তিনি ৮৮৬ ইসায়ীতে বাগদাদে জন্মগ্রহণ করেন এবং ৯৪০ ইসায়ীতে বাগদাদে মারা যান।

তবে ঐতিহাসিক ও শিল্পবোদ্ধাদের মতে, সত্যিকার চারুকলার বিষয় হিসেবে ক্যালিগ্রাফিকে (ক্লাসিক অর্থে) সুসংহত করেন রাজনীতিবিদ, কবি ও ক্যালিগ্রাফি শিল্পী আবু আলী মুহাম্মদ ইবনে আলী ইবনে আল-হুসাইন ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে মুকলা আল-বাগদাদী (মৃ. ৯৪০ খ্রি.) এবং তাঁর ভাই ও ক্যালিগ্রাফি শিল্পী আবু আব্দুল্লাহ ইবনে মুকলা (মৃ. ৯৪৯ খ্রি.)। তারা দু-ভাই ক্যালিগ্রাফিকে আনুপাতিক লেখনীতে বিন্যস্ত এবং একে সৌন্দর্যমণ্ডিত করেন, যেটা ক্যালিগ্রাফির শিল্পমানকে উত্তরোত্তর শানিত করেছে।
ক্যালিগ্রাফির প্রধান ছয়টি শৈলী—সুলুস, নাসখ, মুহাক্কাক, রায়হানী, তাওকী ও রিকার সঠিক পদ্ধতিতে লেখার উদ্ভাবক আবু আলী মুহাম্মদ ইবনে আলী ইবনে আল-হুসাইন ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে মুকলা আল-বাগদাদী (মৃ. ৯৪০ খ্রি.)। মূলত ক্যালিগ্রাফির সবগুলো শৈলী তাঁর পদ্ধতি অনুসারে লেখা হয়। এ জন্য তাঁকেই ক্যালিগ্রাফির জনক বলা হয়। এ বিষয়ে তাঁর লিখিত কিতাবের নাম হচ্ছে—রিসালাহ ইবনে মুকলা। আর পদ্ধতির নাম হচ্ছে—‘আল-খত আল-মানসুব’।
ইরানী ঐতিহাসিকগণ তাকে পারস্য কর্মকর্তা ও নামের শেষে সিরাজী লিখেছেন। পর পর তিন জন আব্বাসীয় খলিফার সময়ে তিনি গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং অন্যান্য প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের চক্রান্তের শিকার হয়ে নির্যাতন ও শাস্তিভোগ করে কারাগারে মারা যান। ক্যালিগ্রাফিতে অসামান্য অবদানের জন্য আরব ঐতিহাসিকগণ তাঁকে আবুল খত ওয়াল খাত্তাত, ইমামুল খাত্তাতীন ওয়া কাওয়ায়িদু খত্তিহ, নাবিউল খত ওয়াল খত্তাতীন উপাধি দিয়েছেন।
কেমন ছিল ইবনে মুকলার ক্যালিগ্রাফি?
বিভিন্ন যুগে বিখ্যাত কবি, ঐতিহাসিক, সাহিত্য ও শিল্প সমালোচকগণ লিখে গেছেন ইবনে মুকলার ক্যালিগ্রাফি নিয়ে অসংখ্য প্রশস্তিগাথা। সেসব কথার মাত্র কয়েকটি তুলে ধরা হলো—
“খত্তুল ওজিরে ইবনি মুকলাহ/বুসতানুন, ক্বলবুন ওয়া মুকাল্লাহ” অর্থাৎ ইবনে মুকলাহর ক্যালিগ্রাফির উপমা হচ্ছে, সেটা পত্রপল্লবিত বাগান, হৃদয় ও সুপেয় ঝরনা। (মরুভূমির লোকেরা ছাড়া সত্যিকার এ উপমা অনুভব করা সম্ভব নয়)।  হিজরী চতুর্থ শতকের বিখ্যাত কবি ইবনে আব্বাদ ইবনে মুকলার ক্যালিগ্রাফিতে মুগ্ধ হয়ে এ কবিতা লেখেন।
বিখ্যাত আরবি শাস্ত্রবিদ ও সাহিত্যিক আবু মনসুর ছালাবি (মৃ. ৪২৯ হি.) বলেন, ‘ইবনে মুকলার ক্যালিগ্রাফির তুলনা সারা দুনিয়ায় বিরল। সত্যিকার ক্যালিগ্রাফি হচ্ছে ইবনে মুকলার ক্যালিগ্রাফি, সেটা যতই দেখা হয় ততই বিস্ময়ে অভিভূত হতে হয়।’
বিখ্যাত শিল্প সমালোচক ইবনে তবাতবা (মৃ. ৭০৯ হি.) বলেন, ‘ইবনে মুকলার ক্যালিগ্রাফি এতটা জনপ্রিয় হয় যে, কুফি শৈলীর যুগের অবসান ঘটিয়ে দেয় ইবনে মুকলার গোলায়িত ধারার ক্যালিগ্রাফি। এরপর একে সুসংহত করেন আরেক বিখ্যাত ক্যালিগ্রাফার ইবনে বাওয়াব।’
বিখ্যাত ক্যালিগ্রাফার ইয়াকুত আল-মুস্তাসিমী তার রচনাসমগ্র মুজামে লিখেছেন, ‘ইবনে মুকলা তাওকি ও রিকা শৈলীতে যে শিল্পমান এনে দিয়েছেন, পৃথিবীতে তার কোনো তুলনা নেই।’
ঐতিহাসিক কলকশান্দি বলেন, ‘ক্যালিগ্রাফিতে হরফের সঠিক পরিমাপ, আকৃতি ও গঠন এবং লিখন-পদ্ধতির যে নীতিমালা ইবনে মুকলা উদ্ভাবন করেছেন, তাতে পৃথিবীর পশ্চিম প্রান্ত থেকে পূর্ব প্রান্ত পর্যন্ত ক্যালিগ্রাফি ছড়িয়ে পড়েছে ও প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে।’
শিল্প সমালোচক তুর্কি আতিয়া আল-জাব্বুরি বলেন, ‘আরবি ক্যালিগ্রাফির ভিত্তি রচিত হয়েছে ইবনে মুকলার হাতে।’
আরেক শিল্প সমালোচক সুহাইলা আল-জাব্বুরি বলেন, ‘ইবনে মুকলা হচ্ছেন আরবি ক্যালিগ্রাফির প্রথম স্থপতি। তাঁর “আল-খত আল-মানসুব” হচ্ছে আরবি ক্যালিগ্রাফির প্রথম নীতিমালার বয়ান।’
বিখ্যাত ক্যালিগ্রাফার ও গবেষক ইউসুফ জিন্নুন বলেন, ‘ইবনে মুকলা তাওকি শৈলীতে পবিত্র কুরআনের দুটি কপি লিখেছেন, যার কোনো তুলনা নেই। তার শৈলীর উৎকর্ষ অনন্য ও শিল্পোত্তীর্ণ। এ জন্য ক্যালিগ্রাফির জগতে তিনি নবিউল খত উপাধিতে ভূষিত হয়েছেন।’
ইবনে মুকলার ওস্তাদগণ কারা?
আসলে ইবনে মুকলার পরিবার বাগদাদে একটি সুন্দর ক্যালিগ্রাফি চর্চার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। পারিবারিক ঐতিহ্য হিসেবে তিনি পিতা-মাতার কাছে ক্যালিগ্রাফির প্রথম সবক লাভ করেন। ঐতিহাসিক ইবনে নাদিম বলেন, আমি ইবনে মুকলার দাদার হাতে লেখা পবিত্র কুরআন দেখেছি। সেটা এত সুন্দর ও মনমুগ্ধকর ছিল যে, তা হৃদয়ে গেঁথে আছে। ইবনে মুকলার ক্যালিগ্রাফির বিখ্যাত ওস্তাদ ছিলেন আবুল আব্বাস ছালাব। তিনি ক্যালিগ্রাফিতে ফাসিহ অর্থাৎ স্বচ্ছ ও স্বচ্ছন্দ হিসেবে খ্যাতিলাভ করেছিলেন। আরেকজন বিখ্যাত উস্তাদ ছিলেন ইবনে দুরাইদ। তিনি ক্যালিগ্রাফিতে জামহার খ্যাতি পেয়েছেন।
তবে ইবনে মুকলার ক্যালিগ্রাফির আসল উস্তাদ ছিলেন ইসহাক বিন ইবরাহীম আল-আহওয়াল আল-ইয়াযিদী। তিনি তুহফাতুল ওয়ামেক নামক ক্যালিগ্রাফির কিতাব লিখেছেন এবং আব্বাসীয় খলিফা আল-মুকতাদির ও খলিফা-পুত্রদের ওস্তাদ ছিলেন। ইবনে মুকলা তার এই ওস্তাদের কিতাব অনুসরণ করে রিসালাতু ফিল খত্তি ওয়াল কিতাবাহ এবং কিতাবুল কলম গ্রন্থদ্বয় রচনা করেন।

ইবনে মুকলার পাঁচ পুত্র-সন্তানের কথা জানা যায়। তারা সবাই বিখ্যাত ক্যালিগ্রাফার হিসেবে খ্যাতিলাভ করেন।
ইবনে মুকলা দুটি কুরআন নকল করেন। এ ছাড়া ত্রিশ পৃষ্ঠার একটি কাব্য “দিওয়ান” রচনা করেন। ঐতিহাসিক ইবনে নাজ্জার তার ইতিহাসগ্রন্থে লিখেছেন, ইবনে মুকলা “ইখতিয়ারুল আশ’য়ার” নামে একটি নির্বাচিত কাব্যমালা লিখেছিলেন। তবে ইবনে মুকলার ক্যালিগ্রাফি বিষয়ক সবচেয়ে বড় গ্রন্থটির নাম হচ্ছে জুমালুল খত। তিনি বাগদাদের পূর্বাংশে দজলা (টাইগ্রিস) নদের শাখানদী নাহরে মুসার তীরে একটি বিশাল ফুল ও খেজুর বাগানের ভেতর প্রশস্ত বাড়িতে বাস করতেন। সেটা ক্যালিগ্রাফি চর্চার একটি বিখ্যাত কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। ঐতিহাসিকগণ বলেন, তিনি এ বাগানবাড়িটি বানাতে দুই লাখ দিনার খরচ করেছিলেন। তবে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে পরাজিত হয়ে তিনবার তার এ বাড়িতে আগুন দেয়া হয়। দ্বিতীয়বার খলিফা কাহিরের নির্দেশে বাড়িটি জ্বালিয়ে দেয়া হয় এবং ৩২৪ হি. শেষবার বাড়িতে আগুন দিয়ে ইবনে মুকলার সন্তানদের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হয়। এতে ঐ এলাকার লোকেদের মুখে মুখে এ বাড়ির করুণ পরিণতি নিয়ে কবিতা উচ্চারিত হতে থাকে।
ইবনে মুকলা স্পষ্টবাদিতা ও ন্যায়নিষ্ঠার কারণে শাসকদের কোপানলে পড়েন। প্রথমে তাঁর ডান হাত কেটে ফেলা হয়, তখন বাম হাত দিয়ে ক্যালিগ্রাফি কলম ধারণ করে লিখতে থাকেন। এরপর তাঁর বাম হাত কেটে ফেলা হয়। তবু তিনি দমে যাননি। কথিত আছে, সত্যকথন তিনি জিহ্বায় কালি লাগিয়ে লিখতে থাকেন। তখন তাঁর জিহ্বা কেটে তাঁকে মৃত্যুমুখে পতিত করা হয়। ক্যালিগ্রাফির প্রতি তাঁর এই উৎসর্গিত অবদান ইতিহাসের পাতায় স্মরণীয় হয়ে আছে।ক্যালিগ্রাফিতে এই ক্যালিগ্রাফারের অবিস্মরণীয় খেদমতের কারণে আজ বিশ্বের অগণিত ক্যালিগ্রাফির শিক্ষার্থী সহজে ক্যালিগ্রাফি করার সুযোগ লাভ করেছে।

লেখক পরিচিতি :

আমি মোহাম্মদ আবদুর রহীম, বাণিজ্য নগরী খুলনার সবচেয়ে বড় মহল্লা টুটপাড়ার এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে ১৯৬৮ সালের জুন মাসে জন্মেছি। তবে সার্টিফিকেটে তারিখ ভিন্ন। কিছু স্মৃতিতে রাখার আগেই মাকে হারিয়ে চাচির হাতে বড় হয়েছি। তিনি আমাকে মানুষ হতে পথ দেখিয়েছেন, সংগ্রাম করতে ও অধিকার আদায়ের মনোবল জুগিয়েছেন।
পরিবারের ঐতিহ্য অনুযায়ী দীনি ইলিম শিখতে খুলনা আলিয়া মাদরাসায় ভর্তি হয়েছি। শৈশব থেকে ছবি আঁকা ও ক্যালিগ্রাফির প্রতি প্রবল আকর্ষণে খুলনা শিশু একাডেমিতে ও বাশের কঞ্চির কলম দিয়ে মাদরাসার ওস্তাদের কাছে ক্যালিগ্রাফি শিখেছি। ঢাকায় এসে গত শতকের ৯০ দশকের প্রথমদিকে ওস্তাদ শহীদুল্লাহ ফজলুল বারী (রহ.) কাছে ক্যালিগ্রাফির মূল খতগুলো শেখার পর সনদ লাভ করেছি। এছাড়া তুরস্কের ফেরহাত কারলু, ইরানের আলী ফারাসাতি, সিদাঘাত জাব্বারি ও মাহবুবে পুররহিমীর কাছেও ক্যালিগ্রাফির শিক্ষা লাভ করেছি।
এরপর ২০০৯ ও ২০১০ সালে ইরান ও আলজেরিয়ায় ক্যালিগ্রাফির ফেস্টিভ্যালে সরকারি সফরে গিয়ে পুরস্কার পেয়েছি। ২০১২ ও ২০১৩ সালে আইসেসকো ও ইরসিকা, তুরস্ক থেকে পুরস্কার পেয়েছি। হাজারের বেশি সংখ্যক ক্যালিগ্রাফি শিল্পকর্ম করা হয়েছে। ক্যালিগ্রাফি বিষয়ে শতাধিক লেখা পত্রপত্রিকা ও গবেষণা জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। ক্যালিগ্রাফি বিষয়ক ছয়টি (একটি ম্যানাসক্রিপ্ট) বই প্রকাশিত হয়েছে। দেশে বিদেশে প্রায় অর্ধশত প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেছি। এছাড়া টিভি চ্যানেলে ২০০৮ সালে আমার স্ক্রিপ্টে একটি ক্যালিগ্রাফি ডকুমেন্টারি প্রচারিত হয়েছে। ২০০৬ সালে ক্যালিগ্রাফ আর্ট নামে একটি পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছি। দুই দশক ধরে ক্যালিগ্রাফি বিষয়ে শিক্ষকতা পেশায় আছি। ২০১৮ সালে ক্যালিগ্রাফি বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচ্যকলা থেকে এমফিল ডিগ্রি অর্জন করেছি।
বর্তমানে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ক্যালিগ্রাফি বিষয়ে পিএইচ.ডি ফেলো হিসেবে গবেষণা কর্মে রত আছি।

Thursday, October 3, 2019

ISESCO Competition and Exhibition 2012 : A memoar

আইসেসকো প্রতিযোগিতা ও প্রদর্শনী ২০১২ : কিছু স্মৃতি কিছু কথা

২০১২ সালের মার্চ-এপ্রিল মাসের কথা। শিল্পী সাইফুল ইসলাম ফোন দিয়ে আইসেসকো প্রোগ্রামের কথা বললেন এবং শিল্পকলায় এবিষয়ে তিনি আমাকে রেফার করেছেন বলে জানালেন। শিল্পকলা থেকে আনোয়ার হোসেন (পরিচালক, চারুকলা বিভাগ) ভাই ফোন দিয়ে বিষয়টি জানালেন। প্রথমে
"ইসলামিক কালচারাল হেরিটেজ অব ঢাকা" বিষয়ক চিত্রকর্ম প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়।
প্রতিযোগিতাটা দু'টি গ্রুপে হয়। আমরা তিনজন-
১. মোহাম্মদ আবদুর রহীম -প্রথম পুরস্কার
২. মাহবুব মুর্শিদ- দ্বিতীয় পুরস্কার
৩. ওসমান হায়াত- তৃতীয় পুরস্কার অর্জন করে।

আর শিল্পী কামরুল হাসান কালন ভাইয়ের ছেলে মোহাম্মদ মুর্শেদও অন্যগ্রুপে প্রাইজ পায়। বাকীদের কথা ভুলে গেছি।
এছাড়া একটা ক্যালিগ্রাফি প্রদর্শনী হয় শিল্পকলা একাডেমী ও বাংলাদেশ ক্যালিগ্রাফি ফাউন্ডেশনের যৌথ আয়োজনে। ঐ প্রদর্শনিতে শিল্পী আরিফুর রহমান ভাইয়ের একটি শিল্পকর্ম বিদেশী মেহমানকে দেয়া হয়।
ছবি- ১.পুরস্কারপ্রাপ্তদের গ্রুপ ছবি
২. শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলি লাকির কাছ থেকে প্রথম পুরস্কারের প্রাইজমানি গ্রহণ করছেন মোহাম্মদ আবদুর রহীম
৩. প্রথম পুরস্কার অর্জনকারী শিল্পকর্ম





Featured Post

Calligraphy Class started for Biggeners

I started new year Calligraphy Class. Today is 2nd class. Any person of no boundary on ages, can learn calligraphy, if he or she interes...