Monday, April 20, 2015

Bangladesh Calligraphy Foundation expressed its support for Saudi Arabia




Bangladesh Calligraphy Foundation expressed its support for Saudi Arabia after its President Mohammad Abdur Rahim spearheaded a special meeting with senior calligraphers of Bangladesh to assess the situation in the Middle East.

The Kingdom of Saudi Arabia led a coalition of nine Arab nations and conducted air strikes against the Shiite Houthi rebels in Yemen. The Houthi rebels ousted Yemeni President Abdu Rabu Mansour Hadi and took over main parts of the country. 

Saudi Arabia’s military operation against the Houthi rebels in Yemen is supported by Bahrain, Egypt, Jordan, Kuwait, Qatar, Morocco, the United Arab Emirates, and Sudan. These predominantly Sunni Muslim countries formed a military coalition called “Operation al-Hazm Storm” or “Operation Decisive Storm.” and it’s a right decision for sovereignty and territorial integrity.

Bangladesh Calligraphy Foundation expressed its support for Saudi Arabia after its President Mohammad Abdur Rahim spearheaded a special meeting with senior calligraphers of Bangladesh to assess the situation in the Middle East.

In a statement, Bangladesh Calligraphy Foundation said, “The meeting concluded that Bangladesh Calligraphy Foundation remains firmly committed to supporting the sovereignty and territorial integrity of Saudi Arabia in accordance with the aspirations of the calligraphers of Bangladesh.”

In addition, Bangladesh Calligraphy Foundation said its president Mohammad Abdur Rahim will be contacting the leadership of brotherly calligraphy organizations to facilitate an early resolution of the crisis and promote peace and unity of the Muslim community.

Thursday, April 16, 2015

মহানবীর (স.) সময়কার লেখা কুরআনের সন্ধান ও প্রসঙ্গ কথা


 

নমুনা-১
মোহাম্মদ আবদুর রহীম

 সম্প্রতি কয়েকটি পত্রিকা ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় মহানবীর (স.) সময়কার লেখা কুরআনের সন্ধান বিষয়ক খবর ও ছবি ছাপা হয়েছে। বইপত্র ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে তথ্য সহজলভ্য ও যাচাইয়ের সুযোগ হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে সঠিক তথ্য বের করার সুযোগ হয়েছে। প্রকাশিত খবরটি সঠিক কিন্তু ছবিটি সঠিক নয়।

দৈনিক সংগ্রাম ও আরটিএনএন ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ছবিটি তুরস্কভিত্তিক ওয়েবসাইট ওয়ার্ল্ড বুলেটিনের বরাত দিয়ে ছেপেছে।
স্ক্রিনশট-১
 ঐ সাইটটিতেও একই ছবি আছে।(স্ক্রিনশট-১) অন্যদিকে সময়ের কন্ঠস্বরসহ কয়েকটি সাইটে প্রকাশিত নিউজের সূত্র ওয়ার্ল্ড বুলেটিন দিলেও ভিন্ন ছবি ছেপেছে।(স্ক্রিনশট-২)
স্ক্রিনশট-২
 প্রকাশিত এই দুটি ছবি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এগুলো কুরআনের পাতা ও লিপির ভেতর জের-জবর-পেশ নোকতা ব্যবহার করা হয়েছে। অথচ মহানবীর (স.) সময়ে কুরআনের লিপিতে এগুলো ছিলনা। উমাইয়া খলিফা মারওয়ানের সময়ে মক্কার প্রশাসক হাজ্জাজ বিন ইউসুফ সাকাফি(৬৬১-৭১৪ ইসায়ি) অনারব ও আরবি ভাষায় অনভিজ্ঞ পাঠকদের সুবিধার্থে কুরআনে জের-জবর-পেশ প্রয়োগ করার ব্যবস্থা করেন। সে সময় বিখ্যাত ব্যাকরণবিদ খলিল ইবনে আহমদ সিরিয় লিপি থেকে স্বরচিহ্নগুলো সংগ্রহ করে কুরআনে প্রয়োগ করেন।
এছাড়া উভয় ছবিতে ব্যবহৃত ক্যালিগ্রাফি লিপিটি মাগরেবি কুফি বা আন্দালুসিয়ান কুফি। পশ্চিম আফ্রিকায় এই লিপিটি ১২-১৩ শতকে কুরআনের লিপি হিসেবে জনপ্রিয়তা অর্জন করে।বর্তমানেও এই লিপিতে সেখানে ক্যালিগ্রাফি করা হয়। এলিপিতে হরফের রেখাগুলো নমনীয় এবং হরফের শেষাংশ ক্রমশ চিকন হয়ে নেমে যায়। হরফের শুরুটা মোটা বৃত্তাকার বা গোলায়িত হয়।নোকতা-জের-জবর-পেশ-শাদ্দাহ স্পষ্ট এবং আয়াত শেষে ত্রিকোণাকার (মুসাল্লাস) লতা বা পেঁচানো দড়ির মত নকশা থাকে।
সুতরাং এটি নিউজের সাথে সংগতিপূর্ণ ছবি নয়। নেটে সার্চ দিয়ে আসল ছবি পাওয়া গেল। সেখানে কার্বন -১৪ ডেটিং-এর জন্য প্রাচীন ঐ গ্রন্থটির একটি ছবি দেয়া আছে।(নমুনা-১)
আলোচিত হেজাজি মায়েল কুফি লিপির কুরআন


উল্লেখ্য, জার্মানির বার্লিন স্টেট লাইব্রেরিতে মহানবী হযরত মুহাম্মদ সা. এর সময়কার লেখা পবিত্র কোরআনের কপির সন্ধান পাওয়া গেছে। প্রায় শত বছর ধরে এটি এই লাইব্রেরিতে সবার অগোচরে পড়ে ছিল।
জুরিখের লাইব্রেরিতে বৈজ্ঞানিকভাবে পরীক্ষা নিরীক্ষার পর ৯৫ শতাংশ নিশ্চিত হওয়া গেছে যে তিন পৃষ্ঠার চর্ম কাগজে কুফি লিপিতে লেখা নমুনাটি ৬৪৯ থেকে ৬৭৫ সালের মধ্যে হাতে লেখা হয়েছিল। তুবিনজেন বিশ্ববিদ্যালয়ের “কুরানিকা প্রকল্পের” গবেষকগণ এটি নিয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধান চালান।
স্থানীয় একটি সংবাদপত্রের খবরে বলা হয়, দীর্ঘমেয়াদী একটি প্রকল্পের আওতায় এটি পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হয়। এজন্য ইউরোপের সমগ্র কোরআনের কপি যাচাই করে দেখা হয়।
বার্লিন লাইব্রেরিতে ১০০ বছর ধরে এই কপি সবার অলক্ষ্যে পড়ে ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, মিশরীয় এক বিজ্ঞানী ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে অথবা বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে এটি জার্মানিতে নিয়ে আসেন।
গবেষকরা ধারণা করছেন, গ্রন্থটি মহানবী (স.) ওফাতের ২০-৪০ বছর পরে লেখা হয়েছে। মূল গ্রন্থের অংশবিশেষ এ গ্রন্থটি ১৫৪ পৃষ্ঠা সম্বলিত। সুরা বনি ইসরাইল(১৭)এর ৩৫ নং আয়াত থেকে সুরা ইয়াসিন(৩৬)এর ৫৬নং আয়াত পর্যন্ত আছে। এর লিপি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ‘হেজাজি মায়েল কুফী’ লিপিতে এটি লেখা হয়েছে। মূল লেখায় নোকতা-জের-জবর-পেশ ছিল না। পরে এতে সংযোজন করার আভাষ পাওয়া যায়। বিরামচিহ্ন হিসাবে গোলায়িত তিনটি নোকতা ত্রিকোণাকার আকারে দেয়া হয়েছে। গ্রন্থটির প্রতিটি পৃষ্ঠা আলাদা করে লিখে জুঝ বাধাই করে গ্রন্থবদ্ধ করা হয়েছে। এতে কোন পৃষ্ঠা নম্বর নেই। বর্তমানে কলমকে ৪৫ডিগ্রি কোনে কেটে লেখা হয় কিন্তু এই লিপির কলম ১৮০ ডিগ্রি কোনে কাটা হয়েছে এবং চাল পুড়িয়ে চিনি, নিশাত ও আরবি গাম(আঠা) মিশিয়ে হাতে তৈরি কালিতে এটি লেখা হয়েছে।তবে শব্দের মধ্যে কোথাও কোথাও যের-জবর বুঝানোর জন্য লাল কালির ফোটা হরফের উপর-নিচ খুব কাছে ব্যবহার করা হয়েছে।কোথাও একই কালিতে হরফের নোকতা খুবই ছোট ও প্রায় অষ্পষ্টাকারে দেয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, কুরআনের লিপি হিসেবে প্রথমদিকে কুফি লিপির স্থানীয় নাম যেমন-হেজাজি, মক্কী, মাদানী ব্যবহৃত হত, তেমনি এর লেখন বৈশিষ্ট্য হিসেবে জযম, মাশ্ক, মায়েল(আইটালিক) নামকরণ করা হত। এই কুফি লিপিতে প্রায় ৩শ বছর কুরআন অনুলিপি করা হয়। পরবর্তী ৩শ বছর মুহাক্কাক লিপিতে কুরআনের অনুলিপি করা হয়। এরপর রায়হানী লিপি তেমন ব্যবহার হয়নি, রায়হানি লিপির কয়েকটি কুরআনের কপির কথা জানা যায়।তারপর তুরস্কের ক্যালিগ্রাফারগণ নাসখি লিপি কুরআন অনুলিপিতে ব্যবহার শুরু করেন এবং এটি এখন পর্যন্ত কুরআনের লিপি হিসেবে টিকে আছে।
ইরানে ইসলামের বিজয়ের পর ইরানের ক্যালিগ্রাফারগণ প্রথমদিকে কুফি লিপিতে কুরআন অনুলিপি করেন। ক্রমশ এটি এত উন্নতি লাভ করে যে, কারামাতিয়ান কুফির নাম জগদ্বিখ্যাত হয়ে যায়। তারপর নাশখ এবং তালিক লিপির সমন্বয় করে ‘নাশতালিক’ লিপি নামে একটি লিপি আবিস্কার হয়। ইরানের ক্যালিগ্রাফারগণ নাশতালিক লিপিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে কুরআন অনুলিপিতে এর ব্যবহার অব্যাহত রাখেন। তবে ইরানের বাইরে এই লিপির কুরআন তেমন একটা নজরে পড়ে না।
পশ্চিম আফ্রিকায় কুফি লিপি স্থানীয়ভাবে পরিবর্তিত হয়ে মাগরেবি লিপি, আন্দালুসিয়ান কুফি, কাইরোয়ান কুফি ইত্যাদি স্থাননামে এবং মাবসুত, মাগরেবি সুলুস, মাগরেবি নাসখী নামে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ লিপিতে কুরআন লিপিবদ্ধ করা হয়।
চীন-জাপানে চিনি লিপি নামে নাশখী লিপির পরিবর্তিতরূপে কুরআন অনুলিপি করা হয়।
ভারত উপমহাদেশে তুর্ক-আফগানদের পৃষ্ঠপোষকতায় কুফি, নাসখি লিপির কুরআন প্রথম পর্যায়ে করা হত। পরে বিহারের ক্যালিগ্রাফার এবং সমুদ্রপথে আগত মিশর-সানআ, হেজাজের ক্যালিগ্রাফারগণ বাংলাদেশে বিহারি লিপি(নাশখি ও কুফি লিপির সমন্বয়) দিয়ে কুরআন অনুলিপি করেন। এটা সুলতানি আমলের শেষ পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। অন্যদিকে গজনি ও কাশ্মিরের একদল ক্যালিগ্রাফার বাঙলার সালতানাত শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেন এবং নাশখি লিপির চমৎকার নজরকাড়া কুরআন অনুলিপি করেন। লৌখনুতে রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় লৌখনু নাসখি নামে একটি লিপিতে কুরআন অনুলিপি করা শুরু হয়। পরবর্তিতে এটি ‘হিন্দি নাশখী’ হিসেবে পরিচিতি পায়।
লৌখনু ছাপা কুরআন, কুরআন কমপ্লেক্স, মদিনা মুনাওয়ারা, সৌদি আরব, ১৪২৮ হিজরি

১৮০০ সালের পর পশ্চিমবঙ্গ থেকে ইংরেজদের মাধ্যমে কুফি লিপির পরিবর্তিত নিম্নমানের একটি ফন্টসেট তৈরি করা হয় এবং এই টাইপসেট দিয়ে হাত কম্পোজে কুরআন ছাপা শুরু হয়। এটি আজও অব্যাহত আছে। এই লিপির কুরআনকে ‘কলিকাতা ছাপা’ কুরআন বলে।
কলকাতা ছাপা কুরআন

 এতে বাঙলার অধিকাংশ মানুষ অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। তবে এতে হাতে লেখা কুরআনের ক্যালিগ্রাফিক বৈশিষ্ট্য ও নান্দনিক ভাব পাওয়া যায় না। তাছাড়া হাতেলেখা কুরআনের যে আধ্যাত্মিক আবেদন রয়েছে, তা থেকে বাঙলার জনগণ বঞ্চিত হয়েছে। অন্যদিকে কুরআন হিফজ করার জন্য মাদ্রাসাগুলোতে লৌখনু ক্যালিগ্রাফিক লিপির কুরআন ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কুরআন হিফজের জন্য কলিকাতা ছাপা কুরআনের ব্যবহারের কোন প্রমাণ পাওয়া যায়না।
কুরআনে ব্যবহৃত বিভিন্ন প্রকার লিপি স্থান ও সময়কালের চিহ্ন বহন করে।ক্যালিগ্রাফিতে দক্ষ ব্যক্তিগণ সহজে এর পর্যালোচনা ও সঠিক বিষয় তুলে আনতে পারেন। শুধু আরবি জানলেই এটা করা যায় না। আর আরবিতে অনভিজ্ঞরা এতে ভুল করা স্বাভাবিক।আশার কথা হচ্ছে, বর্তমানে বাংলাদেশে কুরআনের আরবি ক্যালিগ্রাফির বিষয়ে প্রবল আগ্রহ তৈরি হয়েছে এবং এবিষয়ে দক্ষ লোক তৈরি হচ্ছে। এবিষয়ে সংশ্লিষ্টদের আরো এগিয়ে আসতে হবে এবং এতে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার প্রয়োজন রয়েছে।

তথ্য সুত্র :

. THE RISE OF THE NORTH ARABIC SCRIPT AND ITS KURANIC DEVELOPMENT, WITH A FULL  DESCRIPTION OF THE KURAN MANUSCRIPTS IN THE ORIENTAL INSTITUTE.
THE UNIVERSITY OF CHICAGO PRESS, CHICAGO, ILLINOIS. JUNE 1939
. Hat Sanatindan (calligraphy) ismek husn-i-Hat Hocalari Karma Sergisi  2013 Turkey
. CALLIGRAPHIC ART IN SULTANATE ARCHITECTURE  Shah Muhammad Shafiqullah ASIATIC SOCIETY OF BANGLADESH First Published: February 2012
. ISLAMIC CALLIGRAPHY, ANNEMAIE SCHIMMEL
৫. কাওয়ায়িদুল খত অল কিতাবাহ ওয়া তাত্ববিকাতিহা, ড. খালেদ মাহমুদ মুহাম্মদ ইরফান, দারুল নাশরি দুআলি, সৌদি আরব,২০০৮
৬.আল খত আল আরাবি মিন খিলাল আল মাখতুতাত, এরাবিক ক্যালিগ্রাফি ইন ম্যানাসক্রিপ্ট, রিয়াদ, সৌদি আরব ১৯৮৬
৭. ইন্টারনেট

Sunday, January 4, 2015

বাংলা ভূখন্ডে ক্যালিগ্রাফির পদযাত্রায় শিলালিপির ভূমিকা

 

Muhaqqaq style

-মোহাম্মদ আবদুর রহীম

ক্যালিগ্রাফিকে শুধুমাত্র 'হাতের লেখা' বলে পরিচয় দিলে অসম্পূর্ণ থেকে যায় এর অর্থ। 'সুন্দর হাতের লেখা' বললে আক্ষরিক অর্থ বলা হয়। আরব সিভিলাইজেশন প্রবন্ধে বলা হয়েছে- আরবি লিপিকলা প্রবহমান নকশা এবং জটিল জ্যামিতিক ডিজাইনের সমন্বয়। এই নান্দনিক লিপিকলা সম্পর্কে আলেকজান্দ্রিয়ার দার্শনিক ও গণিতের জনক ইউক্লিদ বলেন, "একটি 'আধ্যাত্মিক কৌশল' হিসেবে ক্যালিগ্রাফিকে গত ১৩শত বছর ধরে আরবদের কলম শুধু বিশুদ্ধ এবং সমৃদ্ধ করেছে।" আসলে ক্যালিগ্রাফি হচ্ছে লিপিকলা বা লিপি দিয়ে যে শিল্পকর্ম করা হয়।
Muhaqqaq style

বাংলা ভূখন্ডে প্রাচীন কাল থেকে যারা শাসন করেছেন, তারা সুবিধামত একটি ভাষাকে রাজভাষা করেছেন এবং নথিপত্রে তা ব্যবহার করেছেন, জনসাধারণের সাথে সংযোগের ক্ষেত্রে এভাষায় জনহীতকর কাজের পরিচিতি ফলক বানিয়েছেন। প্রাচীনকাল থেকে এ অঞ্চলে পাথরে, তাম্র ফলকে এর নিদর্শন দেখা যায়। কাগজ বা টেকসইবিহীন মাধ্যমে এই নিদর্শন পাওয়া দুষ্কর। একটা মজার বিষয় হচ্ছে, ক্যালিগ্রাফির সত্যিকার পদযাত্রা নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে প্রাচীন নিদর্শন খুজতে গিয়ে ১২০৬ সালে (১১২৭ শক) সংস্কৃত হরফে একটি উৎকীর্ণলিপির নমুনা পাওয়া গেছে কামরূপ অঞ্চলে। আসামের ব্রহ্মপুত্র নদের উত্তর তীরে প্রাপ্ত এই শিলালিপিটিতে একটি চমকপ্রদ তথ্য আছে, "১১২৭ শক, মধুমাসের(সম্ভবত চৈত্রমাস) ১৩তম দিবসে কামরূপ তুর্কীদের আক্রমণে পদানত হয়।" কিন্তু এই উৎকীর্ণ লিপিটিতে তথ্য থাকলেও এর প্রয়োগ বৈশিষ্ট্য একেবারে আটপৌরে, এতে কোন শিল্পের ছোঁয়া নেই। অথচ তার বহুকাল পূর্ব থেকে বাঙ্গালায় পাথর খোদাই কাজ, বিশেষ করে উৎকীর্ণ মূর্তি শিল্পমানের শীর্ষে অবস্থান করছিল। আসলে নারীচিত্র অঙ্কন বা খোদাই, যা শিল্পকলার জৈবিকরস সিঞ্চন করলেও, ক্যালিগ্রাফির হরফে তা ফুটিয়ে তোলার বিষয়টি সেখানে দেখা যায় না। অন্যদিকে, বাঙ্গালায় মুসলিম শাসকদের সময় থেকে খোদাই কর্মে ক্যালিগ্রাফির নান্দনিক বা সৌন্দর্য প্রয়োগ সাধারণ বিষয় হয়ে দাড়ায় এবং সেটা আরবি-ফারসি লিপির মাধ্যমে হয়েছে। এমনও দেখা গেছে, একপিঠে মূর্তি উৎকীর্ণ এবং অন্যপিঠে চমৎকার আরবি ক্যালিগ্রাফি উৎকীর্ণ করা হয়েছে। মুসলিম শাসনের আগে স্থাপত্য অলঙ্করণে উৎকীর্ণ মুর্তি বা টেরাকোটায় মুর্তির আধিক্য রয়েছে এবং ফুল-লতা-পাতার ব্যবহার গৌন থেকেছে।
Muhaqqaq style

 অন্যদিকে মুসলিম শাসন শুরুর পর এমন কোন উল্লেখযোগ্য ইমারাত পাওয়া যাবে না যেখানে ক্যালিগ্রাফির ব্যবহার অনুপষ্থিত। সুতরাং বাংলা ভূখন্ডে ক্যালিগ্রাফির প্রচলন করেন মুসলিম শাসকরা। এই পদযাত্রায় মুসলিম তুর্ক-আফগান শাসকদের অবদান অসামান্য। ১২০৫ সালে তুর্কী বংশোদ্ভুত ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজীর বাঙালা বিজয়ের মাধ্যমে শিলালিপিতে আরবি-ফারসি ক্যালিগ্রাফির যাত্রা শুরু হয়। সুলতানী ও মোঘল আমলের (১২০৫-১৭০৭ ইসায়ি) অসংখ্য শিলালিপির মধ্যে প্রায় চারশত নিদর্শন পাওয়া গেছে। সুলতানী আমলের(১২০৫-১৫৬৫ ইসায়ি) অধিকাংশ শিলালিপি আরবিতে এবং মোঘল আমলের(১৫৬৫-১৭০৭ ইসায়ি) অধিকাংশ শিলালিপি ফারসিতে উৎকীর্ণ করা হয়েছে। এসব শিলালিপি মসজিদ, মাদ্রাসা, খানকা, মাজার, কবরগাহ, পুল, প্রশাসনিক ইমারাত ইত্যাদিতে স্থাপন করা হয়েছে। অধিকাংশ ফলকে কুরআন-হাদীসের বাণী, সমকালীন বিষয়, স্থাপণের তারিখ উল্লেখ করা হয়েছে। এতে সে সময়ের ধর্মীয়-রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা করা যায়। বিশেষকরে ক্যালিগ্রাফির উন্নয়ন, গতি-প্রকৃতি এবং এর শৈল্পিক প্রয়োগ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। সুলতানী আমলের শিলালিপির বৈশিষ্ট্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এতে তুরস্কের সমকালীন ক্যালিগ্রাফির প্রভাব ওতপ্রোতভাবে জড়িত। পাথর কিংবা পোড়ামাটিতে উৎকীর্ণ ক্যালিগ্রাফি ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মারক এবং সমসাময়িক তথ্য উন্মোচনে ফলপ্রসু মাধ্যম। বাঙ্গালায় রাজনৈতিকভাবে মুসলিম শাসনের গোড়াপত্তন হয় ১২০৫ ইসায়িতে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খালজির হাতে। এ সময় দিল্লীর সম্রাট ছিলেন কুতব উদ্দিন আইবেক। কিন্তু তারও বহু আগে বাঙ্গালায় মুসলিম জনসমাজ ছিল। রাজা লক্ষণ সেনের দরবারে শেখ জালাল উদ্দিন তাবরেজী নামে একজন মুসলিম বিদ্বান ব্যক্তি সভাসদ ছিলেন। লক্ষণ সেনের আরেক সভা-পণ্ডিত হলায়ুধ মিশ্র রচিত 'শেখ শুভোদয়া'য় আমরা শেখ জালাল উদ্দিনের বর্ণনা দেখতে পাই। রাজসভায় একজন মুসলমান পণ্ডিত থাকার অর্থ হল রাজ্যে একটা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মুসলিম জনগোষ্ঠির বিদ্যমান থাকার প্রমাণ।
Muhaqqaq style

এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত বাঙ্গালার উৎকীর্ণ লিপির সবচেয়ে প্রাচীন নমুনাটি হচ্ছে লালমনিরহাটের হারানো মসজিদ ইস্টকলিপি। পোড়ামাটির তৈরি ইটে উৎকীর্ণ করে কালেমা তৈয়্যবা এবং ৬৯ হিজরি লেখা হয়েছে।
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের জেলা লালমনিরহাটের পঞ্চগ্রাম ইউনিয়নের রামদাস গ্রাম। এখানেই আবিষ্কৃত ৬৯ হিজরিতে নির্মিত মসজিদটির সামনে ফসলের মাঠটি একদা ছিল চকচকার বিল। এলাকার প্রবীণ মানুষের কাছে স্থানটি আজও সাগরের ছড়া নামে পরিচিত, যার অনতিদূরে তিস্তা নদীর অবস্থান। ব্রহ্মপুত্র-তিস্তা অববাহিকাকে বলা হয় পৃথিবীর প্রাচীনতম অববাহিকাগুলোর একটি। সুতরাং এই অববাহিকায় ৬৯ হিজরি বা ৬৪৮ খ্রিষ্টাব্দে একটি মসজিদ নির্মাণের ঘটনা বিস্ময় জাগানিয়া হলেও সেটা অস্বাভাবিক নয়। ব্রিটিশ প্রত্নতাত্ত্বিক টিম স্টিল বলেন, বাংলাদেশ ভূখণ্ডের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলজুড়ে যে প্রাচীন সভ্যতা খ্রিষ্টপূর্ব সময় থেকে গড়ে উঠেছিল, তার সঙ্গে প্রাচীন রোমান ও আরব-সভ্যতার সম্পর্ক ইতিহাসের একটি স্বাভাবিক ঘটনা। সভ্যতার সঙ্গে সভ্যতার এই সম্পর্কের সূত্র ধরেই আরব বণিকেরা লালমনিরহাটের ওই মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন বলে মনে করেন টিম স্টিল।
গবেষকরা ঐ ইস্টকলিপিতে তারিখের স্থলে একটি বিষয় এড়িয়ে গেছেন। "সানাত ১, ৬৯" অর্থাৎ বছরের ১ম মাস(মহররম), ৬৯ হিজরি। ৬৯১ ইসায়িতে মসজিদটি নির্মাণের বিষয়টি নিয়ে গবেষকদের মধ্যে বিতর্ক থাকলেও ইস্টকলিপির সঠিক বয়স নির্ধারণে রাসায়নিক পরীক্ষার কথা জানা যায়নি। এক্ষেত্রে একটি বিষয় উল্লেখ্য, এর লিপি বৈশিষ্ট্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ইসলামের প্রথম শতকে যে লিপিসমূহ ছিল, বিশেষ করে ইরাক থেকে বাঙালার দিকে যে লিপি বিস্তৃতি লাভ করেছিল, তাকে 'খত আল বাহরি' বলা হয়। পরবর্তিতে একে 'বিহারী লিপি' বলে ইতিহাসে উল্লেখ করা হয়েছে। এ নামকরণের দুটো কারণ আমরা খুজে পাই। এক. সমূদ্রপথে এ লিপির খোদাই কারিগর ও লিপিকর বাঙ্গালায় এসেছিলেন এবং সমূদ্রের ঢেউয়ের মত এলিপির গতিপ্রকৃতি ছিল। দুই. বাঙ্গালার পশ্চিম-উত্তর অংশে বিহার এলাকায় পাথরে খোদাই ও পুথিপত্র রচনায় একদল ক্যালিগ্রাফার এ লিপিটিকে জনপ্রিয় করে তোলেন। এজন্য স্থান নামের সাথে এর নামকরণ হয়েছে।

বর্তমান সময়ের ইরাকের বিখ্যাত ক্যালিগ্রাফি গবেষক ইউসুফ জিন্নুনের মতে, সমুদ্র পথে এলিপির বাঙ্গালায় আগমণ এবং উন্নতি সাধনের কারণেই একে 'খত আল বাহরি' নাম দেয়া হয়। খত আল বাহরি অর্থ- সমুদ্র লিপি।
আরেকটি বিষয় এলিপিটির আলিফের নিচের অংশ বামে একটু বেশি ঝুলানো। এ ধরণের আলিফকে বলা হয় "আলিফ মুশা'য়ার"। উৎকীর্ণ লিপিতে আলিফ মুশা'য়ার প্রয়োগ করা ইসলামের প্রথম শতকের লিপির একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য ছিল।
Muhaqqaq style

গবেষকগনের মতে, বাঙ্গালায় কালোপাথর (ব্লাক ব্যাসল্ট) বা বেলে পাথরে (স্যান্ড স্টোন) উৎকীর্ণ ক্যালিগ্রাফির নমুনা সমূহ সুলতানী আমল (১২০০ ইসায়ি) থেকে শুরু হয়েছে। বাঙ্গালায় ইমারাতে ব্যবহৃত ব্লাক ব্যাসল্ট এসেছে ততকালিন বিহার এবং বর্তমানে ভারতের ঝাড়খন্ড রাজ্যের রাজমহলের কালো আগ্নেয়শিলা পাহাড় থেকে। আহমদ হাসান দানী তার "মুসলিম আর্কিটেকচার ইন বেঙ্গাল" গ্রন্থে লিখেছেন, মালদা জেলার রাজমহল পাহাড় থেকে ব্লাক ব্যাসল্ট আনা হত এবং কদাচিৎ বিহার থেকে স্যান্ড স্টোন এবং গ্রানাইট আনা হত। এছাড়া কখনও খোরাসান থেকে ব্লাক ব্যাসল্ট আনা হত বলেও ইতিহাসে পাওয়া যায়।
প্রশ্ন হল, ইস্টক লিপি উৎকীর্ণের বিষয়টির সাথে ব্লাক ব্যাসল্ট ও স্যান্ড স্টোনের সম্পর্ক কী? বাঙ্গালার মুসলিম শাসনের আগের কোন ব্লাক ব্যাসল্ট বা স্যান্ড স্টোনের ওপর আরবি ক্যালিগ্রাফির উৎকীর্ণ নমুনা এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। কিন্তু এর থেকে প্রাচীন পোড়া মাটির ইট এবং তাতে উৎকীর্ণ লিপির নমুনা আছে।
বাঙ্গালায় তুর্ক-আফগান শাসক এবং তাদের সাথে আগত পাথরে উৎকীর্ণ লেখা ও নকশা খোদাইয়ের দক্ষ শিল্পীরা রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় জীবন অতিবাহিত করেছেন। এজন্য সুলতানী আমল ও মোগল আমলের ইমারাতে তাদের শিল্পকর্মের বিস্তৃত নমুনা দেখা যায়।
রাজশাহীর সুলতানগঞ্জে প্রাচীন একটি সেতুতে বাঙ্গালার দ্বিতীয় সুলতান আলাউদ্দিন ওয়াদ্দুনিয়া (আলি মর্দান খালজী, ১২১০-১২১৩ ইসায়ি) সময়ের ব্লাক ব্যাসল্টে উৎকীর্ণ ফার্সি ভাষায় ক্যালিগ্রাফি ফলক পাওয়া যায়। বর্তমানে এটি বরেন্দ্র জাদুঘরে সংরক্ষিত। এর লিপি বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে গবেষক অধ্যাপক ইউসুফ সিদ্দিক বলেন, এটা তাওকি লিপি। এ প্রবন্ধ লেখকের মতে, এর খাড়া রেখা ও আনুভূমিক রেখার গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করে একে খত আল বাহরির স্থাপত্য সংস্করণ বললে অধিক যুক্তিযুক্ত হয়। প্রাচীন তাওকি লিপিতে শব্দের শেষ হরফের শেষাংশ বা লেজ পরবর্তী শব্দের প্রথম হরফের সাথে বিশেষ নিয়মে লেগে যায়। যেটা এ নমুনায় দেখা যায় না। অন্যদিকে আনুভূমিক রেখার শেষাংশ পুষ্ট হয়ে ঢেউয়ের মত ভাব দেখা যায় বাহরি লিপিতে। এ নমুনায় সেটা বেশ পাওয়া যায়। তিন লাইনের এ শিলালিপিতে  লাইন বিভক্তি রেখা আছে। এতে জমিন খোদাই এবং হরফ উচু রাখা হয়েছে।
কালো পাথরে পলিশ(পৃষ্ঠদেশ মসৃণ করার পদ্ধতি) করলে কালো চকচকে ভাব আসে। এর ওপর খোদাই করলে, খোদাই অংশ ছাই রঙের সাদাটে ভাব হয়। হরফ খোদাই করলে অল্প সময়ের মধ্যে একটি নামফলক তৈরি করা যায়। কিন্তু সুলতানী আমলের প্রায় সবগুলো এবং মোগল আমলের অধিকাংশ পাথরে জমিন খোদাই করা হয়েছে, ফলে হরফ এবং বিভক্তি রেখা জমিন থেকে উচু হয়েছে। এটা বলা যত সহজ, হাতে করা ততটাই কঠিন। এ বিষয়টি চিন্তা করলে দক্ষতার উচ্চমান অনুধাবন করা যায়। পাথর খোদাই কাজ দুটি পর্যায়ে সম্পন্ন হয়। প্রথমে একজন ক্যালিগ্রাফার পুরো লেখাটি(টেক্সট) পাথরে কালি বা সিসার কলম দিয়ে একে দেন, তারপর উস্তাদ খোদাইকার ছেনি (খোদাই করা লোহার ছোট বাটালি ধরণের যন্ত্র) দিয়ে হরফের আউট লাইন বের করে দেন, একে কাটাই বলে। দ্বিতীয় পর্যায়ে হরফের আউটলাইন ধরে জমিনকে ৫ থেকে ৮ মিলিমিটার পর্যন্ত খোদাই করে একজন সাগরেদ বা নবিশ খোদাইকার। একে চটানো বলে। খোদাই কাজে ওস্তাদ খোদাইকারের ওপরই ক্যালিগ্রাফির সৌন্দর্যের মান রক্ষার দায়িত্ব বর্তায়। আর এটা দু'এক বছরে অর্জন করা সম্ভব নয়। বাঙ্গালার সুলতানী আমলের মাঝামাঝি সময় থেকে খোদাই দক্ষতা অসাধারণ পর্যায় পৌছেছিল। কিছু কিছু নমুনায় যিনি টেক্সট একেছেন তিনিই খোদাই করেছেন বলে প্রতীয়মান হয়।
পশ্চিম বঙ্গের বিরভুমের সিয়ানে একটি খানকায় সুলতান গিয়াস উদ্দিন ইওদ খালজীর (১২২১ ইসায়ি) সময়ের একটি নামফলক পাওয়া গেছে। যেটার লিপিশৈলিতে তেমন পার্থক্য নেই সুলতানগঞ্জের শিলালিপি থেকে।
রাজশাহীর নওহাটায় একটি অজ্ঞাতনামা মসজিদ ও মাদ্রাসা থেকে বিদ্রোহী খালজী সেনা নায়ক বলাকা খানের (১২২৯-১২৩০ ইসায়ি) সময়ের একটি শিলালিপি উদ্ধার করা হয়। বরেন্দ্র জাদুঘরে বর্তমানে সেটি সংরক্ষিত। লিপির ভাষা ফারসি। লিপি শৈলি সম্পর্কে সুষ্পষ্ট কোন মন্তব্য কেউ করেননি, তাওকি ও সুলুস লিপির মিশ্রন বলে অনেকে মত দিয়েছেন। এ প্রবন্ধ লেখকের মতে, পূর্বের শিলালিপি দুটি থেকে এর বিশেষ পার্থক্য হচ্ছে, উৎকীর্ণ বাহরি লিপির এটি একটি বলিষ্ঠ নমুনা। আলিফ মুশা'য়ার এবং আলিফ মুরাক্কাব বা আলিফ নেহাইয়্যাহ(হরফের সাথে মিলিত আলিফ)সহ ত্বয়া, কাফ, লামের আলিফের(খাড়া রেখা) মাথায় ডানদিকে নিশানাকৃতির জুলফ(আকশির মত তিনকোনা পতাকা) বিজয় অনুভব এবং আনুভূমিক হরফের শেষ প্রান্ত বাহরি লিপির পূর্ণ বৈশিষ্ট্য ধারণ করেছে। এতেও জমিন খোদাই(রিভার্স খোদাই) করা হয়েছে। আয়তাকার প্যানেলের এধরণের কাজ তুর্কি ধারার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এ শিলালিপির ক্যালিগ্রাফার এবং খোদাইকার তুর্কি বংশোদ্ভুত বা ঐ ধারার কাজ সম্পর্কে পূর্ণ ওয়াকিফহাল বলে অনুমান করা যায়। এ শিলালিপির মিম মুরাক্কাব আউয়াল(মিলিত প্রথম মিম) মাথার শুরু এবং শেষ সংযুক্ত নয়। জিমের  মাথার(র'স) প্রথমাংশ বৃত্তাকার ও ভারি। কাফ মুরাক্কাবের আলিফের পেট বা বুক বরাবর ডানপাশে আল সুওবানি(অজগরাকৃতি রেখা) শিলালিপিটিকে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করেছে। এ তিনটি শিলালিপির আলোচনা থেকে খালজী শাসনামলের (১২০৩-১২৩০ ইসায়ি) ক্যালিগ্রাফির শৈলি বিষয়ক একটি চিত্র পাওয়া যায়। স্থাপত্যে বাহরি লিপির প্রয়োগ এবং এর দ্রুত উন্নয়নে ক্যালিগ্রাফার ও খোদাইকারের আন্তরিকতা এবং নিপুনতা অর্জনে একনিষ্ঠতা প্রশংসনীয়।
Bihari style

ইলিয়াসশাহী (১৩৪২-১৪৮৭ ইসায়ি) শিলালিপিতে খাটি আরবি শৈলিতে ফিরে যাওয়ার একটি প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়। সুলুস লিপির অসাধারণ প্রয়োগ হয়েছে এসময়।
হাদরাত পান্ডুয়ার আদিনা মসজিদ ক্যালিগ্রাফি (১৩৭৪ ইসায়ি) সুলুস লিপির অন্যতম সেরা উদাহরণ। মিহরাবে, দেয়ালে ক্যালিগ্রাফির সাথে ফুলেল অলংকরণের ব্যবহার আরো সৌন্দর্যমণ্ডিত করেছে একে। মিহরাবে উৎকীর্ণ সুলুস লিপিটির নান্দনিক রূপ-সৌন্দর্য সমসাময়িক তুর্কি সুলুস লিপির সাথে পূর্ণ সামঞ্জস্যশীল। তবে মসজিদের অন্য দেয়ালে উৎকীর্ণ সুলুস লিপিতে বেশ পার্থক্য আছে। এতে ধারণা হয়, মসজিদটিতে একাধিক ক্যালিগ্রাফার কাজ করেছেন। মসজিদে মহিলা নামাজীদের প্রবেশদ্বারের উপরে কালিমা তৈয়্যবার সুলুস শৈলির কম্পোজিশনটি বাঙ্গালায় মধ্যযুগের উৎকীর্ণ ক্যালিগ্রাফির অন্যতম সেরা কাজ।
অন্যদিকে নবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে গাজীপীরের মাজার থেকে প্রাপ্ত শিলালিপিটি সুলুস শৈলি ভেঙ্গে তুগরায় রূপান্তর বলা যায়। খাড়া হরফের মাথাগুলো মোটা আর ভারি। বাশের বেড়ার মত হরফের খাড়া রেখার বুক ও পেট বরাবর কাফ হরফের সুওবান আর ফি, নুন দিয়ে বন্ধন সৃষ্টি। নিচে হরফের কম্পোজিশন দিওয়ানী লিপির তলোয়ার কম্পোজিশন সদৃশ করা হয়েছে। এটা তুর্কি ধারার বাঙ্গালা সংস্করণ বলা যায়। এধরণের কাজ থেকে বেংগল তুগরার স্বকীয় ধারা বিকশিত হয়। সুলতান আহমদ শাহ(১৪৩২-১৪৪১ ইসায়ি) সময়ের শিলালিপি এটি।

গৌড়ের চান্দ দরওয়াজা শিলালিপিটি বারবাক শাহের(১৪৬৬-১৪৬৭ ইসায়ি) সময়ের। তুগরার অসাধারণ একটি নমুনা এটি। খাড়া আয়তন বিশিষ্ট দুই সারি ঘরগুলোতে চমৎকার তুগরা করা হয়েছে। চারপাশে বর্ডারে সুলুস লিপি এবং শামসি (সূর্য) সদৃশ ফুল দিয়ে অলঙ্করণ করা হয়েছে। এটি সমসাময়িক ক্যালিগ্রাফির একটি সেরা কাজ।
সুলতানী আমলের শেষদিকে মাহমুদ শাহের (১৫৩৪-১৫৩৫ ইসায়ি) সময়ের একটি অজ্ঞাতনামা শিলালিপির ছবিতে দেখা যায় সুলুস লিপিকে চমৎকার করে উৎকীর্ণ করা হয়েছে। এসময় পোড়া মাটির ফলকে সুলুস লিপির কিছু কাজ হয়েছে। সুলতানী আমলের ক্যালিগ্রাফি ছিল পরিপূর্ণ আরবি লিপি শৈলিতে প্রত্যাবর্তনের একটা প্রচেষ্টা। এসময়ে ভাষাগত বিষয়টি ফারসীর পাশাপাশি আরবির প্রতি বিশেষ টান পরিলক্ষিত হয়। সুলতানি আমলে প্রচুর মসজিদ ও মাদ্রাসা একসাথে গড়ে ওঠে এবং বিশুদ্ধ আরবি চর্চার দিকে মনোনিবেশ করতে দেখা যায়। সুলুস লিপি হচ্ছে আরবি লিপিশৈলির মধ্যে সবচেয়ে মর্যাদাবান এবং নান্দনিক শৈলি। বাঙ্গালার স্বাধীন সুলতানগণ যথার্থই ক্যালিগ্রাফির সৌন্দর্যবোধের সমঝদার ছিলেন এবং সেরা শৈলিটিরই প্রসার ও উন্নয়নে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছেন।
সুলুস শৈলির আধুনিক সংস্করণ মুহাক্কাক লিপি। এটি মূলত: "খত আল-মাসাহিফ" বা কুরআনের লিপি হিসেবে বহুল পরিচিত। কুরআন লিপিবদ্ধ করণে চামড়ার অধিক ব্যবহারের জন্য কুরআনকে মুসহাফও বলা হয়। ইসায়ি ৯ম শতকের প্রথমদিকে আব্বাসীয় খলিফা মামুনের সময়ে লিপিটির উন্নয়ন ও প্রসার হয়। এটি ক্যালিগ্রাফির জনক ইবনে মুকলার(মৃ. ৯৪০ ইসায়ি)হাতে পরিশীলিত এবং ইবনে বাওয়াব(মৃ. ১০২২ ইসায়ি) ও ইয়াকুত আল মুস্তাসিমীর(মৃ. ১২৯৮ ইসায়ি)হাতে শৈলিতে শীর্ষ মানে পৌছায়। বাঙ্গালায় সুলতানী আমলে উৎকীর্ণ লিপি হিসেবে মুহাক্কাক লিপির ব্যবহার ক্যালিগ্রাফির উৎকর্ষতার একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। বরেন্দ্র মিউজিয়ামে রক্ষিত(নং-৩২৪) ত্রিকোণাকার একটি কালো পাথরের ওপর উৎকীর্ণ এ লিপিটি মুহাক্কাক শৈলির একটি উৎকৃষ্ট নমুনা। গবেষক অধ্যাপক ইউসুফ সিদ্দিক একে সুলুস লিপি বলেছেন। সম্ভবত সাধারণ দৃষ্টিতে সুলুস এবং মুহাক্কাক একই রকম দৃশ্যমান হওয়ায় এ বিভ্রাট হয়েছে। সুলুস লিপিতে লফজে জালালাহ'র "হা" এবং মুহাক্কাক লিপিতে লফজে জালালাহ'র "হা" সাধারণত ভিন্ন হয়ে থাকে। মুহাক্কাক লিপি সুলুস লিপি থেকে অপেক্ষাকৃত সরল, স্পষ্ট এবং এতে তাজবিদ ও তাশকিল প্রয়োজন মাফিক প্রয়োগ করা হয়। সতর বা বেজ লাইনের নিচে হরফের অংশ প্রায় ২০ থেকে ৩৫ ডিগ্রি কোণে ছয় নোকতার বেশী প্রলম্বিত হয়। অন্যদিকে সুলুস লিপিতে এটি ৪৫ ডিগ্রি কোণে ছয় নোকতা বরাবর হয়। ইয়া মাজহুল বা কাফ সুওবান সুলুস লিপি থেকে আলাদা। সতরের উপরে হরফের খাড়া দন্ড সুলুস লিপি থেকে একটু লম্বা এবং কিছুটা চিকন হয় এবং লম্ব দন্ডের নিচের অংশ বেশ খানিকটা চিকন হয় এবং মুরাক্কাব হলে নিচের অংশ প্রায় দুই নোকতা বরাবর চেরা হয়।। মুহাক্কাক এবং রায়হানী লিপি পার্থক্য করা আরো কঠিন। একই কলমে রায়হানী লিপি মুহাক্কাক থেকে সাইজে কিছুটা ছোট এবং আরো স্পষ্ট হয়। বিশেষ করে মুহাক্কাক লিপিতে বিসমিল্লাহর একটি বিখ্যাত ফর্ম আছে। প্রায় তিনশ বছর এলিপিটি কুরআনের লিপি হিসেবে ব্যবহারের সময় বিসমিল্লাহ'র এ ফর্মটির অধিক ব্যবহার দেখা যায়। বরেন্দ্র জাদুঘরে রক্ষিত শিলালিপিটির বিসমিল্লাহটি সেই ফর্মে উৎকীর্ণ করা হয়েছে।
গবেষক অধ্যাপক ইউসুফ সিদ্দিক রচিত "হিস্টোরিকাল এন্ড কালচারাল এস্পেক্ট অব দ্যা ইসলামিক ইনসক্রিপশনস অব বেঙ্গল: আ রিফ্লেক্টিভ স্টাডি অব সাম এপিগ্রাফিক ডিসকোভারিস" গ্রন্থের ২৪,২৯,৩১,৩৩ নং ইনসক্রিপশনকে সুলুস বলে তিনি উল্লেখ করলেও মূলত সেগুলো মুহাক্কাক লিপি।
ড. আবদুল করিম তার "করপাস অব দ্যা এরাবিক এন্ড পারসিয়ান ইনসক্রিপশনস অব বেঙ্গল" গ্রন্থে প্লেট-২৯-এ, ৩৬, ৪২-এ, ৪৩-এ'র লিপি নাশখ বলে উল্লেখ করেছেন। আসলে এগুলোও মুহাক্কাক লিপির উৎকৃষ্ট নিদর্শন।
মোগল শাসকরা (১৫৭৬-১৭৫৭ ইসায়ী) শিয়া প্রভাবিত ছিলেন। ফারসি ভাষার মত ফার্সি লিপি নাস্তালিক লিপির প্রতি তাদের আকর্ষণ ছিল প্রায় প্রশ্নাতীত। এজন্য সুলতানী আমলের ক্যালিগ্রাফার ও খোদাইকারদের একটি বৃহদাংশ বিপাকে পড়েন। এসময় বাঙ্গালার উৎকীর্ণ লিপিতে একটি জগাখিচুড়ি অবস্থা দেখা যায়। সামান্য সংখ্যক ব্যতিক্রম ছাড়া আরবি মিশ্রিত ফারসি শিলালিপিতে সৌন্দর্য বলতে তেমন কিছু ছিল না। তবে কিছুকালের মধ্যে ইরান থেকে লিপি শিল্পী ও খোদাইকারদের বাঙালায় আগমন ঘটে এবং নাস্তালিক লিপি দিয়ে চমৎকার সব নামফলক তৈরি হতে থাকে। নামফলকে কুরআন-হাদিসের বাণী বাদ দিয়ে ফার্সি কবিতার ছত্র জায়গা করে নেয়। মাজারগুলো পুজার আখড়ায় পরিণত হয়। নানা নামে-বেনামে অসংখ্য পীর-আওলিয়ার মাজারের উদ্ভব ও ইমামবাড়া প্রতিষ্ঠিত হয়। মোগলরা বাঙ্গালায় শাসন ক্ষমতা দখল করে ইসলামী আকিদা ও তমুদ্দুনের তরীটি ডুবিয়ে দেয়। আরবি ক্যালিগ্রাফির জৌলুস নিভিয়ে ফার্সি ক্যালিগ্রাফির নিশান উড়ায়।
ফার্সি ক্যালিগ্রাফারদের 'শিরিন দাস্ত' 'জরীন দাস্ত' উপাধী আর রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া হয়। এসময় গুলজারের মত কিছু ফার্সি লিপি বাঙ্গালায় ছড়িয়ে পড়ে। কুরআন লেখায়ও এর বেশ প্রভাব পড়ে। ইরানী নাশখ লিপিতে অনেক কুরআনের কপি করা হয়। মোগল আমলের নামকরা কিছু ক্যালিগ্রাফারের উল্লেখ ইতিহাসে পাওয়া গেলেও সুলতানী আমলের ক্যালিগ্রাফারদের প্রায় সবাই ইতিহাস থেকে নিচিহ্ন হয়ে গেছেন। অথচ একটু গভীর দৃষ্টিতে দেখলে ধারণা করা যায়, সুলতানী আমলের বাঙ্গালার আরবি ক্যালিগ্রাফি স্বকীয়তা, বিশুদ্ধতা ও শৈলির দিক দিয়ে বিশ্ব মানের ছিল। একই সময়ে(১২০০-১৬০০ ইসায়ি) তুরস্কের পাথরে উৎকীর্ণ সুলুস, নাশখ, মুহাক্কাক, রায়হানী লিপির হুবহু মিল বাঙ্গালার ক্যালিগ্রাফিতে বিদ্যমান। এমনকি বিরাম চিহ্ন, শামসী ও পৃথক বর্ডার লাইন দিয়ে খোপ খোপ করার পদ্ধতি ও খোদাই(জমিন খোদাই) নীতিমালা হুবহু তুরস্কের ক্যালিগ্রাফির  অনুসরন করা হয়েছে। অপেক্ষাকৃত রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় খোদাই মান ও লিপির শৈল্পিক প্রয়োগ উৎকৃষ্ট ও নিখুত হয়েছে। অন্যদিকে প্রত্যন্ত অঞ্চলের খোদাই কাজে সেই মান অনুপস্থিত। এছাড়া ধারণা করা যায়, এসব লিপির পাঠক ও শিল্পমান সমঝদার সেসময়ে কম ছিল না।
ক্যালিগ্রাফির আধ্যাত্মিক আবেদন এতটাই প্রবল হয়েছিল যে, মূর্তিখোদাই পাথরের উল্টা পাশ মসৃন করে তাতে ক্যালিগ্রাফি করা হয়েছে। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে রক্ষিত ঢাকার মান্দ্রা(মান্ডা) মসজিদ (খোদাই কাল-১৪৩৩ ইসায়ি) উৎকীর্ণ লিপির ফলকের উল্টাপাশে বিষ্ণু বা তারা মূর্তি খোদাই করা আছে। এলিপিটিকে ড. আবদুল করিম প্রচলিত নাশখ উল্লেখ করেছেন, অথচ এটি বিহারী লিপির চমৎকার নিদর্শন। এ ফলকটির চার লাইন লেখার মধ্যে শেষ এক লাইন ও ৩য় লাইনের শেষের অংশ বিশেষ খোদাই সম্পন্ন হয়নি, তবে হরফের আউট লাইন খোদাই করা হয়েছে। এ শিলালিপি থেকে পাথর খোদাইয়ের পদ্ধতি সম্পর্কে ধারণা করা যায়। বর্তমানে পুরাণ ঢাকার শাখারী পট্টি ও বায়তুল মোকারম এলাকায় পাথর খোদাই এচিং পদ্ধতিতে রুপান্তর ঘটেছে। অথচ এক দশক আগেও হাতে পেনসিল ডিজাইন ও হাতুড়ি-ছেনি দিয়ে হাত খোদাই চালু ছিল। তবে মোঘল আমলের শেষ দিকে এসে রিভার্স বা জমিন খোদাই উঠে যায়, সেখানে হরফ খোদাই চালু হয় আর ইংরেজ শাসন আমলে ইংরেজি হরফ খোদাই তাদের ঐতিহ্য বিধায় গত এক দশক পর্যন্ত হাতে হরফ খোদাই চালু ছিল। বর্তমানে এচিং পদ্ধতিতেও হরফ খোদাই চালু আছে। তবে ইসলামী ঐতিহ্য হচ্ছে জমিন খোদাই করে হরফকে উচু করা। এটি যেমন কঠিন, তেমনি নান্দনিক ও দক্ষতার পরিচায়ক।
বাংলা ভূখন্ডে ক্যালিগ্রাফির পদযাত্রায় শিলালিপির ভূমিকা অপরিসীম। আমাদের শিকড় সন্ধানে এ বিষয়ে আরো গবেষণার প্রয়োজন এবং এতে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার জোর দাবি জানাই।
----------------------------------------------------------------------------------------------------------------
লেখক- এমফিল গবেষক, চারুকলা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Friday, December 26, 2014

সাত্তার জামে মসজিদ


রাজধানী ঢাকার অদূরে শ্রীপুরের মাওনায় আন্তর্জাতিক মানের বিশাল আয়তনের একটি মসজিদ নির্মান করা হচ্ছে। বিশিষ্ট্য ব্যবসায়ী আবদুস সাত্তার এ মসজিদটির নির্মাণ ব্যয়ভার বহন করছেন।

মসজিদটিতে পর্যায়ক্রমে আরবি ক্যালিগ্রাফি এবং ইসলামী নকশা দিয়ে সুশোভিত করা হবে। চমৎকার দৃষ্টিনন্দন শিল্প সুষমা মন্ডিত এ স্থাপনায় তিনশতেরও বেশি ন্থানে ক্যালিগ্রাফি ও অলঙ্করনের কাজ হবে। এজন্য তুরস্কের বিখ্যাত ক্যালিগ্রাফার ও কুরআন-মুফাসসির মোজাফ্ফর আহমদ সম্ভাব্য ক্যালিগ্রাফি(সুলুস লিপি) এবং পার্শ্ব অলঙ্করণ কাগজে ও সফট কপি করে পাঠান। একাজে তার পক্ষ থেকে সহায়তা করেন ঢাকাস্থ তুর্কি স্কুলের শিক্ষক আবদুল কারিম। ক্যালিগ্রাফি ও সৌন্দর্য বর্ধন কাজে প্রয়োজনীয় ক্যালিগ্রাফি ও নকশা সম্পাদনা, তদারকি, সমন্বয় এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে নতুন করে অঙ্কনের কাজ ও স্থাপনের সার্বিক দায়িত্ব পালন করেন বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় ক্যালিগ্রাফার মোহাম্মদ আবদুর রহীম। পবিত্র স্থাপনাটির মূল নকশা ও নির্মাণ করেন বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় আর্কিটেক্ট কে এম মাহফুজুল হক জগলুল এবং তার প্রতিষ্ঠান ইন্টার্ডেক সিস্টেম।  মূল স্থাপনার বাহিরে এ্যাকোয়া হোয়াইট মার্বেল পাথরে উৎকীর্ণ করে প্রায় দেড় হাজার বর্গফুট সুলুস লিপিতে আরবি ক্যালিগ্রাফি করা হবে। মসজিদের অভ্যন্তরে মার্বেল পাথর, জিপসাম টেরাকোটা, টাইলস গ্লেজ ফায়ার ও রঙের মাধ্যমে ক্যালিগ্রাফি ও অলঙ্করণ করা হবে। বাহির ও ভেতরে পবিত্র কুরআনের আয়াত দিয়ে সুলুস শৈলীতে এসব ক্যালিগ্রাফি করা হবে। এছাড়া মিহরাব, আর্চ, সিলিং, কলাম, বীম ও দেয়ালে ফুল-লতা-পাতার মটিফ নির্ভর ইসলামী নকশা ও আসমাউল হুসনার ক্যালিগ্রাফি সহকারে সুশোভিত করা হবে। এটি পাথর এনগ্রেভ, জিপসাম প্লাস্টার কাটাই, রঙ, টাইলস বার্ণ ও এ্যাম্বুস পদ্ধতিতে করা হবে।


বাংলাদেশে সাত্তার জামে মসজিদ প্রথম ব্যতিক্রমধর্মী একটি আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানের অলঙ্করণশোভিত মসজিদ। বলা যায়, বাংলাদেশে মসজিদ স্থাপত্যে ক্যালিগ্রাফি ও অলঙ্করনে আন্তর্জাতিক শিল্পমানের সর্বোচ্চ প্রয়োগ এটিই প্রথম। বাংলাদেশে মসজিদ নির্মাণে আন্তর্জাতিক মানের ক্যালিগ্রাফি ও ইসলামী অলঙ্করণ শিল্পের অসাধারণ প্রয়োগের ক্ষেত্রে সাত্তার মসজিদ অগ্রদূত ও স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

২০১২ সালে মসজিদটির নির্মাণ কাজ শুরু হয় এবং ২০১৪ সালে প্রায় সম্পন্ন হয়েছে।
সিলিং নকশা।
উত্তর পাশে ক্যালিগ্রাফি
ড্রপ ওয়ালের নিচের নকশা
সদর দরজা
দক্ষিণ পাশ
করিডোর ক্যালিগ্রাফি
করিডোর ক্যালিগ্রাফি দক্ষিণ পাশ
দক্ষিণ পাশ

Tuesday, August 5, 2014

Calligraphy painting 1434

 

  I desired to attend Calligraphy Competition of Madina Munawara 1434 H. So, I made a calligraphy painting.

Allahumma ezal bi al-madina du'fa ma za'alat bi makkah min al-mubarakah-Al-Hadith.   

ইসমাইল গুলজী : ক্যালিগ্রাফি পেইন্টিংয়ের পথিকৃৎ

 

Catalog cover of Gulgee painting calligraphy

২০০৬ সালের মার্চ মাস। ঢাকায় এশিয়ান বিয়েনাল চলছে। জাদুঘরের মহাপরিচালক মাহমুদুল হক বললেন গুলজীর অসাধারণ ক্যালিগ্রাফি পেইন্টিংয়ের কথা। ক্যালিগ্রাফি পেইন্টিংয়ে রঙ ও রেখার যে আশ্চর্য সম্মিলন, তা তিনি নিদর্শন হিসেবে আমাদের সামনে রেখে গেছেন। গুলজীর সাথে সাক্ষাতের জন্য শিল্পকলায় গেলাম। অনুষ্ঠান শেষে হোটেল পূর্বানীতে তিনি কথা বলতে রাজি হলেন।


Ismail Gulgee and Mohammad Abdur Rahim, Hotel Purbani lobby, Dhaka, March 2006

তিনি জানালেন, ক্যালিগ্রাফি তাকে আধ্যাত্মিকতার অনুভব এনে দেয়। ক্যালিগ্রাফি পেইন্টিং করার সময় একধরণের অলৌকিক আবেশ বোধ করেন। বিশেষ করে সোনালী-রুপালী রংয়ের ভেতর ইসলামিক ঐতিহ্য এবং একটি রাজকীয় ভাব থাকায় তার ক্যালিগ্রাফিতে রঙগুলো স্বাভাবিকভাবে ব্যবহার করেছেন।

Calligraphy Painting, Allahu Akbar

গুলজীর পেইন্টিংয়ে একটি রহস্যময়তা দর্শককে আবিষ্ট করে। যেন এর হরফগুলো নাচছে, দৃষ্টির পিপাসা ক্রমশ ঘুরে বেড়ায় পেইন্টিংজুড়ে আর সৌন্দর্যসুধা পান করে।


বাংলাদেশের ক্যালিগ্রাফির সম্পর্কে তিনি উচ্ছাস প্রকাশ করে বলেন, অচিরেই বাংলাদেশের ক্যালিগ্রাফি বিশ্বের শিল্পাঙ্গনে সুনাম অর্জনে সক্ষম হবে। ক্যালিগ্রাফি শিল্পীদের একনিষ্ঠতা এবং দক্ষতার প্রশংসা করে বলেন, বাংলাদেশের ক্যালিগ্রাফি শিল্পীদের কাজে নিপুনতা ও একাগ্রতা তাকে মুগ্ধ করেছে। ক্যালিগ্রাফি শিল্পকে বাচিয়ে রাখতে নবীন শিল্পীদের এগিয়ে আসার প্রতি গুরুত্বারোপ করেন তিনি। এছাড়া ক্যালিগ্রাফি চর্চা ও পৃষ্ঠপোষকতা দিতে যেসব প্রতিষ্ঠান সহায়তা দিচ্ছে তাদেরকে তিনি ধন্যবাদ জানান। পাকিস্তান সরকার ক্যালিগ্রাফির উন্নয়নে পৃষ্ঠপোষকতা যেভাবে দিচ্ছে, বাংলাদেশের ক্যালিগ্রাফির উন্নয়নে বাংলাদেশ সরকারকে সেভাবে ব্যাপক পৃষ্ঠপোষকতা প্রদানের অনুরোধ জানান তিনি।


শুধু উপমহাদেশে নয়, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এ শিল্পী দেশে-বিদেশে অনেক সম্মান ও পুরস্কার অর্জন করেন। তিনি ছিলেন শিল্পজগতের এক উজ্জ্বল জোতিষ্ক।
-মোহাম্মদ আবদুর রহীম




-------------------------------------------------
12th Asian Art Biennale, Bangladesh
Gulgee, a living legend
Fayza Haq

If calligraphy is a movement, Gulgee is the finest of Pakistan's calligraphy painters. If movement and its rhythms give rise to dance, Gulgee is a choreographer in painting and its rhythm gives rise to dance. He captures the sensations of pure movement in colours .

His gestures are mature, and the designs of his works have acquired a sophistication over the years without losing their raw power. The use of body language in Gulgee's paintings suggests similarity with Action Painting. The designs and expressions which emerge from the works of painters like Jackson Pollock and Kline are very different. The difference arises from the culture and the sensibility. Gulgee's latest creations go beyond calligraphy and they talk of Divine love and creation.

It is often said of Gulgee that his work creates a continuous dialogue between the East and West. Perhaps for this reason his work displayed at Sotheby's in 1998 far exceeded expectations. Animated and emotional, his arms and shoulders are muscled and broadened by years of painting with arms fully stretched across broad surfaces. He works in oil, crayons, brush and ink, onyx, lapis lazuli, copper and bronze. He is a craftsman, sculptor, and painter and is close to the Renaissance ideal of the complete artist as exists in our times.

Calligraphy Sculpture and Painting

Gulgee, born Mohammad Ismaili on October 25, 1926 in Peshawar and nicknamed "Gul-jee" which means flower, was a brilliant student. He got a first class first for his B.Sc. degree and got a scholarship to study in Columbia university where he earned MS degree in Hydraulics in 1947 and another in Soil Mechanics in 1948. When he did King Zahir Shah of Afghanistan's portrait, he was invited to go to Afghanistan. There he came across lapis lazuli and marble with which he did his unique portraits.

Sitting in Dhaka, which he came to as a guest of the Asian Biennale, Gulgee said," It is here in Dhaka that I first met my wife in 1960 and eventually married her. I'm delighted to meet some of the artists here like Syed Jahangir and Murtaja Basir, whom I've known from Karachi. I'm fascinated by all the works that I've come across here as from Australia, Mexico and Sri Lanka. I understand that there are more than 30 countries participating here. I'm totally impressed by the work that's on here despite the limited budget. Even progressive countries are sometimes not doing as much as they are doing here in Bangladesh today despite limited resources.

"The people here are very sensitive and have progressed in leaps and bounds in music, drama and dance. They have treated the visiting artists with greatest respect and affection and an artist needs this like the air that he breathes. The catalogue for the Biennale is also very impressive."

Asked if it has been easy to reach the position of the "Living legend", as critics claim him to be in his country, Gulgee says," Reaching any place has been secondary in my mind. What I always try to do is work better and better. If you aim at fame it does not easily come. Have your own star and follow it."
http://archive.thedailystar.net/2006/03/15/d603151401110.htm

আর্কাইভ থেকে "আর্ট এক্সিবিশন ২০০৮"

  Art & Photo Exhibition 2008

Catalog of the exhibition

১৬-১৮ নভেম্বর ২০০৮ ইসলামিক সিভিলাইজেশন ইন সাউথ এশিয়া উদযাপন উপলক্ষে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ইরসিকা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ আয়োজনে চারুকলার জয়নুল গ্যালারিতে ইসলামিক আর্টের শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন শিল্পীর অর্ধ শতাধিক শিল্পকর্ম নিয়ে আর্ট এবং ফটো প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়।
Mohammad Abdur Rahim


শিল্পিরা হলেন- মুর্তজা বশীর, ড. আবদুস সাত্তার, সাইফুল ইসলাম, ইব্রাহীম মন্ডল, আরিফুর রহমান, আমিনুল ইসলাম আমিন, মোহাম্মদ আবদুর রহীম ও ফটোগ্রাফার বাবু আহমেদ।
Right to left- Artist Ibrahim Mondol, Arifur Rahman, Syful Islam, Aminul Islam Amin, Mohammad Abdur Rahim and Photographer Babu Ahmed

মাইজভান্ডারে নকশা ও ক্যালিগ্রাফি

চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির মাইজভান্ডারে সৌন্দর্য বর্ধনের অংশ হিসেবে ২০১৪ সালে নকশা ও ক্যালিগ্রাফি সংযোজন করা হয়। বাংলাদেশ ক্যালিগ্রাফি ফাউন্ডেশন সাফল্যের সাথে এ কাজ সম্পন্ন করে।

Calligraphy and Design inside of Darbar.
ভেতরের নিচের রীমে সুরা ইয়াসিন এবং উপরের রীমে সুরা রাহমানের আয়াতাংশ কুফি মুজাখরাফাহ লিপিতে করা হয়।

Kufi Muzakhrafah style. Sura Yasin.
বাইরের রীমে সুরা কাহফ সুলুস লিপিতে করা হয়। এখানে প্লাস্টার কাটাই পদ্ধতিতে কাজ করা হয়। আর রঙ হিসেবে এক্রিলিক ব্যবহার করা হয়েছে। চাপাইয়ের ওস্তাগরেরা এই প্লাস্টারের কাজ করেছে। ক্যালিগ্রাফি ও নকশা করেছেন মোহাম্মদ আবদুর রহীম।


Monday, July 8, 2013

প্রাচীন বাঙালায় ক্যালিগ্রাফি





সুন্দরের প্রতি মানুষের আকর্ষণ হচ্ছে একটি স্বভাবগত বিষয়। সভ্যতার বিকাশের ধারায় মানুষের রুচিবোধের মাত্রার পরিবর্তন হয়। খাদ্যাভাস, পোষাক, আবহাওয়া, ভৌগলিক অবস্থান প্রভৃতি মানুষকে বৈশিষ্ট্যগত প্রভাব ও জীবনধারা চয়নে পাল্টে ফেলে। সৌন্দর্যবোধকে শুধু নিজের জন্য নয়, উত্তর-পুরুষের জন্য নিদর্শন স্বরূপ রেখে যেতে যে প্রয়াস দেখা যায়, ক্যালিগ্রাফি তার ভেতর একটি অন্যতম মাধ্যম। এটি একাধারে উন্নত রুচিবোধ এবং তথ্যের সমাহারসহ সৌন্দর্য্যের আকর হিসেবে বিবেচিত হয়।

বাঙালা ভূখণ্ডের প্রাচীন নিদর্শন, বিশেষ করে ক্যালিগ্রাফির যে নমুনা পাওয়া যায় তা হাজার বছরের পুরনো। গবেষকগণ প্রাচীন বাঙালা বলে যে ভূখণ্ডকে চিহ্নিত করেছেন, সেটা বর্তমান বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল তথা পদ্মার দক্ষিণ পাড় থেকে সুন্দরবন অঞ্চল পর্যন্ত এলাকা। বাঙালার আরেকটি পরিচয় হচ্ছে, চট্টগ্রামকে বেংগাল বলে উল্লেখ করেছেন প্রাচীন ইউরোপীয় ভূগোল গবেষকরা। তবে ইসলাম পূর্ব সময়ে আরবরা সমূদ্র পথে ব্যবসায়-রুট হিসেবে বর্তমান বঙ্গোপসাগরকে বাহর আল হারাকান্দ বলে উল্লেখ করেছেন এবং সুন্দরবন অঞ্চলকে ‘বাঙালা’ বলে তাদের নথিপত্রে লিখে গেছেন।

চন্দ্ররাজাদের সময় বাঙালার ভৌগলিক সীমারেখা বৃদ্ধি পায়। তখন থেকে সমগ্র দক্ষিণ বাঙালাই 'বাঙালা' নামে অভিহিত হতে থাকে। প্রাচীনকালে বাঙালা ও বঙ্গ নামে আলাদা দুটি রাষ্ট্র ছিল। বাঙালাকে "বাঙালা দেশ" নামে ইতিহাসের পাতায় দেখতে পাওয়া যায়। বঙ্গ হচ্ছে বর্তমান পশ্চিম বঙ্গ এলাকা। এটা ‘গৌড়’ নামেও দীর্ঘকাল পরিচিত ছিল।

বাঙালা এবং বঙ্গকে সর্বপ্রথম একত্রিত করে একক রাষ্ট্রে পরিণত করেন সুলতান শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ (১৩৪২-১৩৫৭ ইসায়ি)। তারিখ-ই-ফিরোজশাহী রচয়িতা শামস-ই-সিরাজ আফিফ এজন্য শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহকে উপাধি দিয়েছিলেন 'শাহ-ই-বাঙালা', 'সুলতান-ই-বাঙালা' এবং 'শাহ-ই-বাঙ্গালিয়ান'। এই একক রাষ্ট্রের নাম হয় 'মুলুকে বাঙালাহ'। আরব বিশ্বে 'মুলুকে বাঙালাহ' একটি মর্যাদাবান, সমৃদ্ধ ও সম্পদশালী এবং উন্নত দেশ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।

অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন বাঙালায় মুসলিম শাসন স্বাধীনভাবে ১৩৩৮ ইসায়ি থেকে শুরুর পর মুসলিম সমাজের ব্যাপক প্রসার হয়। কিন্তু ইতিহাসের তথ্য-প্রমাণে দেখা যায়, ইসলামের প্রথম শতক থেকেই বাঙালায় মুসলিম জনসমাজের বিস্তৃতি শুরু হয়েছে।

পাথর কিংবা পোড়ামাটিতে উৎকীর্ণ ক্যালিগ্রাফি ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মারক এবং সমসাময়িক তথ্য উন্মোচনে ফলপ্রসু মাধ্যম। বাঙালায় রাজনৈতিকভাবে মুসলিম শাসনের গোড়াপত্তন হয় ১২০৩ ইসায়িতে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খালজির হাতে। এ সময় দিল্লীর সম্রাট ছিলেন কুতব উদ্দিন আইবেক। কিন্তু তারও বহু আগে বাঙালায় মুসলিম জনসমাজ ছিল। রাজা লক্ষণ সেনের দরবারে শেখ জালাল উদ্দিন তাবরেজী নামে একজন মুসলিম বিদ্বান ব্যক্তি সভাসদ ছিলেন। লক্ষণ সেনের আরেক সভা-পণ্ডিত হলায়ুধ মিশ্র রচিত 'শেখ শুভোদয়া'য় আমরা শেখ জালাল উদ্দিনের বর্ণনা দেখতে পাই। রাজসভায় একজন মুসলমান পণ্ডিত থাকার অর্থ হল রাজ্যে একটা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মুসলিম জনগোষ্ঠির বিদ্যমান থাকার প্রমাণ।

এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত বাঙালার উৎকীর্ণ লিপির সবচেয়ে প্রাচীন নমুনাটি হচ্ছে লালমনিরহাটের হারানো মসজিদ ইস্টকলিপি। পোড়ামাটির তৈরি ইটে উৎকীর্ণ করে কালেমা তৈয়্যবা এবং ৬৯ হিজরি লেখা হয়েছে।


বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের জেলা লালমনিরহাটের পঞ্চগ্রাম ইউনিয়নের রামদাস গ্রাম। এখানেই আবিষ্কৃত ৬৯ হিজরিতে নির্মিত মসজিদটির সামনে ফসলের মাঠটি একদা ছিল চকচকার বিল। এলাকার প্রবীণ মানুষের কাছে স্থানটি আজও সাগরের ছড়া নামে পরিচিত, যার অনতিদূরে তিস্তা নদীর অবস্থান। ব্রহ্মপুত্র-তিস্তা অববাহিকাকে বলা হয় পৃথিবীর প্রাচীনতম অববাহিকাগুলোর একটি। সুতরাং এই অববাহিকায় ৬৯ হিজরি বা ৬৪৮ খ্রিষ্টাব্দে একটি মসজিদ নির্মাণের ঘটনা বিস্ময় জাগানিয়া হলেও সেটা অস্বাভাবিক নয়। ব্রিটিশ প্রতœতাত্ত্বিক টিম স্টিল বলেন, বাংলাদেশ ভূখণ্ডের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলজুড়ে যে প্রাচীন সভ্যতা খ্রিষ্টপূর্ব সময় থেকে গড়ে উঠেছিল, তার সঙ্গে প্রাচীন রোমান ও আরব-সভ্যতার সম্পর্ক ইতিহাসের একটি স্বাভাবিক ঘটনা। সভ্যতার সঙ্গে সভ্যতার এই সম্পর্কের সূত্র ধরেই আরব বণিকেরা লালমনিরহাটের ওই মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন বলে মনে করেন টিম স্টিল।

গবেষকরা ঐ ইস্টকলিপিতে তারিখের স্থলে একটি বিষয় এড়িয়ে গেছেন। "সানাত ১, ৬৯" অর্থাৎ বছরের ১ম মাস(মহররম), ৬৯ হিজরি। ৬৯১ ইসায়িতে মসজিদটি নির্মাণের বিষয়টি নিয়ে গবেষকদের মধ্যে বিতর্ক থাকলেও ইস্টকলিপির সঠিক বয়স নির্ধারণে রাসায়নিক পরীক্ষার কথা জানা যায়নি। এক্ষেত্রে একটি বিষয় উল্লেখ্য, এর লিপি বৈশিষ্ট্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ইসলামের প্রথম শতকে যে লিপিসমূহ ছিল, বিশেষ করে ইরাক থেকে বাঙালার দিকে যে লিপি বিস্তৃতি লাভ করেছিল, তাকে 'খত আল বাহরি' বলা হয়। পরবর্তিতে একে বিহারী লিপি বলে ইতিহাসে উল্লেখ করা হয়েছে। এ নামকরণের দুটো কারণ আমরা খুজে পাই। এক. সমূদ্রপথে এ লিপির খোদাই কারিগর ও লিপিকর বাঙালায় এসেছিলেন এবং সমূদ্রের ঢেউয়ের মত এলিপির গতিপ্রকৃতি ছিল। দুই. বাঙালার পশ্চিম-উত্তর অংশে বিহার এলাকায় পাথরে খোদাই ও পুথিপত্র রচনায় একদল ক্যালিগ্রাফার এ লিপিটিকে জনপ্রিয় করে তোলেন। এজন্য স্থান নামের সাথে এর নামকরণ হয়েছে।

বর্তমান সময়ের ইরাকের বিখ্যাত ক্যালিগ্রাফি গবেষক ইউসুফ জিন্নুনের মতে, সমুদ্র পথে এলিপির বাঙালায় আগমণ এবং উন্নতি সাধনের কারণেই একে 'খত আল বাহরি' নাম দেয়া হয়। খত আল বাহরি অর্থ- সমুদ্র লিপি।

আরেকটি বিষয় এলিপিটির আলিফের নিচের অংশ বামে একটু বেশি ঝুলানো। এ ধরণের আলিফকে বলা হয় "আলিফ মুশা'য়ার"। উৎকীর্ণ লিপিতে আলিফ মুশা'য়ার প্রয়োগ করা ইসলামের প্রথম শতকের লিপির একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য ছিল।

গবেষকগনের মতে, বাঙালায় কালোপাথর (ব্লাক ব্যাসল্ট) বা বেলে পাথরে (স্যান্ড স্টোন) উৎকীর্ণ ক্যালিগ্রাফির নমুনা সমূহ সুলতানী আমল (১২০০ ইসায়ি) থেকে শুরু হয়েছে। বাঙালায় ইমারাতে ব্যবহৃত ব্লাক ব্যাসল্ট এসেছে ততকালিন বিহার এবং বর্তমানে ভারতের ঝাড়খন্ড রাজ্যের রাজমহলের কালো আগ্নেয়শিলা পাহাড় থেকে। আহমদ হাসান দানী তার মুসলিম আর্কিটেকচার ইন বেঙ্গাল গ্রন্থে লিখেছেন, মালদা জেলার রাজমহল পাহাড় থেকে ব্লাক ব্যাসল্ট আনা হত এবং কদাচিৎ বিহার থেকে স্যান্ড স্টোন এবং গ্রানাইট আনা হত। এছাড়া কখনও খোরাসান থেকে ব্লাক ব্যাসল্ট আনা হত বলেও ইতিহাসে পাওয়া যায়।

প্রশ্ন হল ইস্টক লিপি উৎকীর্ণের বিষয়টির সাথে ব্লাক ব্যাসল্ট ও স্যান্ড স্টোনের সম্পর্ক কী? বাঙালার মুসলিম শাসনের আগের কোন ব্লাক ব্যাসল্ট বা স্যান্ড স্টোনের ওপর আরবি ক্যালিগ্রাফির উৎকীর্ণ নমুনা এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। কিন্তু এর থেকে প্রাচীন পোড়া মাটির ইট এবং তাতে উৎকীর্ণ লিপির নমুনা আছে।

বাঙালায় তুর্ক-আফগান শাসক এবং তাদের সাথে আগত পাথরে উৎকীর্ণ লেখা ও নকশা খোদাইয়ের দক্ষ শিল্পীরা রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় জীবন অতিবাহিত করেছেন। এজন্য সুলতানী আমল ও মোগল আমলের ইমারাতে তাদের শিল্পকর্মের বিস্তৃত নমুনা দেখা যায়।



১২০৫ থেকে ১৭০৭ ইসায়ি পর্যন্ত বাঙালায় পাথরে উৎকীর্ণ ইসলামী ক্যালিগ্রাফির সংখ্যা প্রায় ৪০০(চারশত)। সুলতানী আমলের প্রায় সবগুলি পাথরে উৎকীর্ণ ক্যালিগ্রাফি আরবিতে এবং মোগল আমলের অধিকাংশ ফার্সিতে লেখা। এসব ক্যালিগ্রাফি মসজিদ, মাদ্রাসা, খানকাহ, মাজার, দরগাহ এবং কবরগাহে স্থাপন করা হয়। ক্যালিগ্রাফিতে কুরআনের আয়াত, হাদিস এবং সমসাময়িক অনেক তথ্য স্থান পায়। এটা সমসাময়িক সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক চিত্র অনুধাবনে যথেষ্ট সহায়ক। এবিষয়ে এখন গবেষণাকর্মও দেখা যায়।

রাজশাহীর সুলতানগঞ্জে প্রাচীন একটি সেতুতে বাঙালার দ্বিতীয় সুলতান আলাউদ্দিন ওয়াদ্দুনিয়া (আলি মর্দান খালজী, ১২১০-১২১৩ ইসায়ি) সময়ের ব্লাক ব্যাসল্টে উৎকীর্ণ ফার্সি ভাষায় ক্যালিগ্রাফি ফলক পাওয়া যায়। বর্তমানে এটি বরেন্দ্র জাদুঘরে সংরক্ষিত। এর লিপি বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে গবেষক অধ্যাপক ইউসুফ সিদ্দিক বলেন, এটা তাওকি লিপি। এ প্রবন্ধ লেখকের মতে, এর খাড়া রেখা ও আনুভূমিক রেখার গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করে একে খত আল বাহরির স্থাপত্য সংস্করণ বললে অধিক যুক্তিযুক্ত হয়। প্রাচীন তাওকি লিপিতে শব্দের শেষ হরফের শেষাংশ বা লেজ পরবর্তী শব্দের প্রথম হরফের সাথে বিশেষ নিয়মে লেগে যায়। যেটা এ নমুনায় দেখা যায় না। অন্যদিকে আনুভূমিক রেখার শেষাংশ পুষ্ট হয়ে ঢেউয়ের মত ভাব দেখা যায় বাহরি লিপিতে। এ নমুনায় সেটা বেশ পাওয়া যায়। তিন লাইনের এ শিলালিপিতে  লাইন বিভক্তি রেখা আছে। এতে জমিন খোদাই এবং হরফ উচু রাখা হয়েছে।

কালো পাথরে পলিশ(পৃষ্ঠদেশ মসৃণ করার পদ্ধতি) করলে কালো চকচকে ভাব আসে। এর ওপর খোদাই করলে, খোদাই অংশ ছাই রঙের সাদাটে ভাব হয়। হরফ খোদাই করলে অল্প সময়ের মধ্যে একটি নামফলক তৈরি করা যায়। কিন্তু সুলতানী আমলের প্রায় সবগুলো এবং মোগল আমলের অধিকাংশ পাথরে জমিন খোদাই করা হয়েছে, ফলে হরফ এবং বিভক্তি রেখা জমিন থেকে উচু হয়েছে। এটা বলা যত সহজ, হাতে করা ততটাই কঠিন। এ বিষয়টি চিন্তা করলে দক্ষতার উচ্চমান অনুধাবন করা যায়। পাথর খোদাই কাজ দুটি পর্যায়ে সম্পন্ন হয়। প্রথমে একজন ক্যালিগ্রাফার পুরো লেখাটি(টেক্সট) পাথরে কালি বা সিসার কলম দিয়ে একে দেন, তারপর উস্তাদ খোদাইকার ছেনি (খোদাই করা লোহার ছোট বাটালি ধরণের যন্ত্র) দিয়ে হরফের আউট লাইন বের করে দেন, একে কাটাই বলে। দ্বিতীয় পর্যায়ে হরফের আউটলাইন ধরে জমিনকে ৫ থেকে ৮ মিলিমিটার পর্যন্ত খোদাই করে একজন সাগরেদ বা নবিশ খোদাইকার। একে চটানো বলে। খোদাই কাজে ওস্তাদ খোদাইকারের ওপরই ক্যালিগ্রাফির সৌন্দর্যের মান রক্ষার দায়িত্ব বর্তায়। আর এটা দু'এক বছরে অর্জন করা সম্ভব নয়। বাঙালার সুলতানী আমলের মাঝামাঝি সময় থেকে খোদাই দক্ষতা অসাধারণ পর্যায় পৌছেছিল। কিছু কিছু নমুনায় যিনি টেক্সট একেছেন তিনিই খোদাই করেছেন বলে প্রতীয়মান হয়।

পশ্চিম বঙ্গের বিরভুমের সিয়ানে একটি খানকায় সুলতান গিয়াস উদ্দিন ইওদ খালজীর (১২২১ ইসায়ি) সময়ের একটি নামফলক পাওয়া গেছে। যেটার লিপিশৈলিতে তেমন পার্থক্য নেই সুলতানগঞ্জের শিলালিপি থেকে।



রাজশাহীর নওহাটায় একটি অজ্ঞাতনামা মসজিদ ও মাদ্রাসা থেকে বিদ্রোহী খালজী সেনা নায়ক বলাকা খানের (১২২৯-১২৩০ ইসায়ি) সময়ের একটি শিলালিপি উদ্ধার করা হয়। বরেন্দ্র জাদুঘরে বর্তমানে সেটি সংরক্ষিত। লিপির ভাষা ফারসি। লিপি শৈলি সম্পর্কে সুষ্পষ্ট কোন মন্তব্য কেউ করেননি, তাওকি ও সুলুস লিপির মিশ্রন বলে অনেকে মত দিয়েছেন। এ প্রবন্ধ লেখকের মতে, পূর্বের শিলালিপি দুটি থেকে এর বিশেষ পার্থক্য হচ্ছে, উৎকীর্ণ বাহরি লিপির এটি একটি বলিষ্ঠ নমুনা। আলিফ মুশা'য়ার এবং আলিফ মুরাক্কাব বা আলিফ নেহাইয়্যাহ(হরফের সাথে মিলিত আলিফ)সহ ত্বয়া, কাফ, লামের আলিফের(খাড়া রেখা) মাথায় ডানদিকে নিশানাকৃতির জুলফ(আকশির মত তিনকোনা পতাকা) বিজয় অনুভব এবং আনুভূমিক হরফের শেষ প্রান্ত বাহরি লিপির পূর্ণ বৈশিষ্ট্য ধারণ করেছে। এতেও জমিন খোদাই(রিভার্স খোদাই) করা হয়েছে। আয়তাকার প্যানেলের এধরণের কাজ তুর্কি ধারার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এ শিলালিপির ক্যালিগ্রাফার এবং খোদাইকার তুর্কি বংশোদ্ভুত বা ঐ ধারার কাজ সম্পর্কে পূর্ণ ওয়াকিফহাল বলে অনুমান করা যায়। এ শিলালিপির মিম মুরাক্কাব আউয়াল(মিলিত প্রথম মিম) মাথার শুরু এবং শেষ সংযুক্ত নয়। জিমের  মাথার(র'স) প্রথমাংশ বৃত্তাকার ও ভারি। কাফ মুরাক্কাবের আলিফের পেট বা বুক বরাবর ডানপাশে আল সুওবানি(অজগরাকৃতি রেখা) শিলালিপিটিকে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করেছে। এ তিনটি শিলালিপির আলোচনা থেকে খালজী শাসনামলের (১২০৩-১২৩০) ক্যালিগ্রাফির শৈলি বিষয়ক একটি চিত্র পাওয়া যায়। স্থাপত্যে বাহরি লিপির প্রয়োগ এবং এর দ্রুত উন্নয়নে ক্যালিগ্রাফার ও খোদাইকারের আন্তরিকতা এবং নিপুনতা অর্জনে একনিষ্ঠতা প্রশংসনীয়।

ইলিয়াসশাহী (১৩৪২-১৪৮৭ ইসায়ি) শিলালিপিতে খাটি আরবি শৈলিতে ফিরে যাওয়ার একটি প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়। সুলুস লিপির অসাধারণ প্রয়োগ হয়েছে এসময়। হাদরাত পান্ডুয়ার আদিনা মসজিদ ক্যালিগ্রাফি (১৩৭৪ ইসায়ি) সুলুস লিপির অন্যতম সেরা উদাহরণ। মিহরাবে, দেয়ালে ক্যালিগ্রাফির সাথে ফুলেল অলংকরণের ব্যবহার আরো সৌন্দর্যমণ্ডিত করেছে একে। মিহরাবে উৎকীর্ণ সুলুস লিপিটির নান্দনিক রূপ-সৌন্দর্য সমসাময়িক তুর্কি সুলুস লিপির সাথে পূর্ণ সামঞ্জস্যশীল। তবে মসজিদের অন্য দেয়ালে উৎকীর্ণ সুলুস লিপিতে বেশ পার্থক্য আছে। এতে ধারণা হয়, মসজিদটিতে একাধিক ক্যালিগ্রাফার কাজ করেছেন। মসজিদে মহিলা নামাজীদের প্রবেশদ্বারের উপরে কালিমা তৈয়্যবার সুলুস শৈলির কম্পোজিশনটি বাঙালায় মধ্যযুগের উৎকীর্ণ ক্যালিগ্রাফির অন্যতম সেরা কাজ।

অন্যদিকে নবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে গাজীপীরের মাজার থেকে প্রাপ্ত শিলালিপিটি সুলুস শৈলি ভেঙ্গে তুগরায় রূপান্তর বলা যায়। খাড়া হরফের মাথাগুলো মোটা আর ভারি। বাশের বেড়ার মত হরফের খাড়া রেখার বুক ও পেট বরাবর কাফ হরফের সুওবান আর ফি, নুন দিয়ে বন্ধন সৃষ্টি। নিচে হরফের কম্পোজিশন দিওয়ানী লিপির তলোয়ার কম্পোজিশন সদৃশ করা হয়েছে। এটা তুর্কি ধারার বাঙালা সংস্করণ বলা যায়। এধরণের কাজ থেকে বেংগল তুগরার স্বকীয় ধারা বিকশিত হয়। সুলতান আহমদ শাহ(১৪৩২-১৪৪১ ইসায়ি) সময়ের শিলালিপি এটি।

গৌড়ের চান্দ দরওয়াজা শিলালিপিটি বারবাক শাহের(১৪৬৬-১৪৬৭ ইসায়ি) সময়ের। তুগরার অসাধারণ একটি নমুনা এটি। খাড়া আয়তন বিশিষ্ট দুই সারি ঘরগুলোতে চমৎকার তুগরা করা হয়েছে। চারপাশে বর্ডারে সুলুস লিপি এবং শামসি (সূর্য) সদৃশ ফুল দিয়ে অলঙ্করণ করা হয়েছে। এটি সমসাময়িক ক্যালিগ্রাফির একটি সেরা কাজ।

সুলতানী আমলের শেষদিকে মাহমুদ শাহের (১৫৩৪-১৫৩৫ ইসায়ি) সময়ের একটি অজ্ঞাতনামা শিলালিপির ছবিতে দেখা যায় সুলুস লিপিকে চমৎকার করে উৎকীর্ণ করা হয়েছে। এসময় পোড়া মাটির ফলকে সুলুস লিপির কিছু কাজ হয়েছে। সুলতানী আমলের ক্যালিগ্রাফি ছিল পরিপূর্ণ আরবি লিপি শৈলিতে প্রত্যাবর্তনের একটা প্রচেষ্টা। এসময়ে ভাষাগত বিষয়টি ফারসীর পাশাপাশি আরবির প্রতি বিশেষ টান পরিলক্ষিত হয়। সুলতানি আমলে প্রচুর মসজিদ ও মাদ্রাসা একসাথে গড়ে ওঠে এবং বিশুদ্ধ আরবি চর্চার দিকে মনোনিবেশ করতে দেখা যায়। সুলুস লিপি হচ্ছে আরবি লিপিশৈলির মধ্যে সবচেয়ে মর্যাদাবান এবং নান্দনিক শৈলি। বাঙালার স্বাধীন সুলতানগণ যথার্থই ক্যালিগ্রাফির সৌন্দর্যবোধের সমঝদার ছিলেন এবং সেরা শৈলিটিরই প্রসার ও উন্নয়নে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছেন।

মোগল শাসকরা (১৫৭৬-১৭৫৭ ইসায়ী) শিয়া প্রভাবিত ছিলেন। ফারসি ভাষার মত ফার্সি লিপি নাস্তালিক লিপির প্রতি তাদের আকর্ষণ ছিল প্রায় প্রশ্নাতীত। এজন্য সুলতানী আমলের ক্যালিগ্রাফার ও খোদাইকারদের একটি বৃহদাংশ বিপাকে পড়েন। এসময় বাঙালার উৎকীর্ণ লিপিতে একটি জগাখিচুড়ি অবস্থা দেখা যায়। সামান্য সংখ্যক ব্যতিক্রম ছাড়া আরবি মিশ্রিত ফারসি শিলালিপিতে সৌন্দর্য বলতে তেমন কিছু ছিল না। তবে কিছুকালের মধ্যে ইরান থেকে লিপি শিল্পী ও খোদাইকারদের বাঙালায় আগমন ঘটে এবং নাস্তালিক লিপি দিয়ে চমৎকার সব নামফলক তৈরি হতে থাকে। নামফলকে কুরআন-হাদিসের বাণী বাদ দিয়ে ফার্সি কবিতার ছত্র জায়গা করে নেয়। মাজারগুলো পুজার আখড়ায় পরিণত হয়। নানা নামে-বেনামে অসংখ্য পীর-আওলিয়ার মাজারের উদ্ভব ও ইমামবাড়া প্রতিষ্ঠিত হয়। মোগলরা বাঙালায় শাসন ক্ষমতা দখল করে ইসলামী আকিদা ও তমুদ্দুনের তরীটি ডুবিয়ে দেয়। আরবি ক্যালিগ্রাফির জৌলুস নিভিয়ে ফার্সি ক্যালিগ্রাফির নিশান উড়ায়।

ফার্সি ক্যালিগ্রাফারদের 'শিরিন দাস্ত' 'জরীন দাস্ত' উপাধী আর রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া হয়। এসময় গুলজারের মত কিছু ফার্সি লিপি বাঙালায় ছড়িয়ে পড়ে। কুরআন লেখায়ও এর বেশ প্রভাব পড়ে। ইরানী নাশখ লিপিতে অনেক কুরআনের কপি করা হয়। মোগল আমলের নামকরা কিছু ক্যালিগ্রাফারের উল্লেখ ইতিহাসে পাওয়া গেলেও সুলতানী আমলের ক্যালিগ্রাফারদের প্রায় সবাই ইতিহাস থেকে নিচিহ্ন হয়ে গেছেন।

বাঙালার প্রাচীন ক্যালিগ্রাফির লিপিকর, খোদাইকারদের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এখন পাওয়া যায় না। সেক্ষেত্রে ক্যালিগ্রাফির নমুনা পর্যালোচনা ও গবেষণার মাধ্যমে এর শৈল্পিক মূল্যায়ন হতে পারে। এটা করা সম্ভব হলে সমসাময়িক শিল্প-সংস্কৃতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে এবং এর ঐতিহ্যধারার পথ বের করা সহজ হবে।


বিশ্বে ইসলামী স্থাপত্যকলায় বাঙালার যে বিশাল অবদান, বিশেষ করে ক্যালিগ্রাফিতে, তা ব্যাপকভাবে গবেষণার দাবি রাখে।     -মোহাম্মদআবদুর রহীম
##

Friday, May 3, 2013

আন্তর্জাতিক ক্যালিগ্রাফি প্রতিযোগিতায় আবদুর রহীম ও ওসমান হায়াতের পুরস্কার লাভ


Mohammad Abdur Rahim's Calligraphy work






তুরস্কে ওআইসি'র সাংস্কৃতিক বিভাগ রিসার্স সেন্টার ফর ইসলামিক হিস্ট্রি, আর্ট এন্ড কালচার (আইআরসিআইসিএ)-এর নবম আন্তর্জাতিক ক্যালিগ্রাফি প্রতিযোগিতায় প্রথমবারের মত বাংলাদেশ থেকে প্রখ্যাত লিপিশিল্পী মোহাম্মদ আবদুর রহীম ও ওসমান হায়াত, কুফি শৈলিতে পুরস্কার অর্জন করেন। তারা ইনসেন্টিভ এ্যাওয়ার্ড লাভ করেন। এ প্রতিযোগিতায় ৩৯টি দেশের ৬৭২ জন শিল্পীর ৯শ আর্টওয়ার্ক জমা পড়ে। এর মধ্যে ২৩টি দেশের ৭৭ জন লিপিশিল্পী পুরস্কার অর্জন করেন। পুরস্কারপ্রাপ্তদেরকে নগদ অর্থ, সনদ এবং পুরস্কারপ্রাপ্ত আর্টওয়ার্ক সম্বলিত একটি আকর্ষণীয় ক্যাটালগ দেয়া হবে।

Mohammad Abdur Rahim

মোহাম্মদ আবদুর রহীম বাংলাদেশ ক্যালিগ্রাফি ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং ক্যালিগ্রাফি সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা সেক্রেটারি। তিনি এক দশকের বেশি সময় ধরে ক্যালিগ্রাফির ট্রেডিশনাল ও পেইন্টিং বিষয়ে শিক্ষকতা করছেন। তিনি ২০০৯ সালে ইরানে বিসমিল্লাহ ক্যালিগ্রাফি লোগো প্রতিযোগিতায় এ্যাওয়ার্ড এবং আইসেসকো ইসলামিক হেরিটেজ ঢাকা-২০১২'র ১ম পুরস্কার অর্জন করেন। তিনি ক্যালিগ্রাফি ফেস্টিভ্যাল ও ওয়ার্কশপে অংশগ্রহনের জন্য ইরান ও আলজেরিয়া সফর করেছেন। ক্যালিগ্রাফির তত্ত্বীয় ও ব্যহারিক বিষয়ে তার লেখা ৬টি বই প্রকাশিত হয়েছে।

Osman Hayat

ওসমান হয়াত বাংলাদেশ ক্যালিগ্রাফি ফাউন্ডেশনের সদস্য ও ট্রেডিশনাল ক্যালিগ্রাফি বিষয়ে ওস্তাদ মোহাম্মদ আবদুর রহীমের কাছে শিক্ষা লাভ ও সনদ পেয়েছেন। তিনি হাফেজে কুরআন। আইসেসকো ইসলামিক হেরিটেজ ঢাকা-২০১২'র জুনিয়র গ্রুপে ৩য় পুরস্কার অর্জন করেন।

তুরস্কের ইস্তাম্বুলে ওআইসি'র সাংস্কৃতিক বিভাগ রিসার্স সেন্টার ফর ইসলামিক হিস্ট্রি, আর্ট এন্ড কালচার (আইআরসিআইসিএ) প্রতি তিন বছর পর পর এ প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। এবার নবম প্রতিযোগিতা ওআইসি'র মহাসচিব ইকলেমেদ্দিন ইসানগলু'র নামে অনুষ্ঠিত হয়॥ এই প্রতিযোগিতা ধারাবাহিকভাবে অনুষ্ঠানে ইকলেমেদ্দিনের অসামান্য অবদান রয়েছে। ১৯৮৬ সালে ১ম প্রতিযোগিতা বিখ্যাত লিপিশিল্পী হামিদ আল আমিদী(১৮৯১-১৯৮২) নামে অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৮৯ সালে ২য় প্রতিযোগিতা ইয়াকুত আল মুস্তাসিমী(মৃ.১২৯৮) নামে; ১৯৯২ সালে ৩য় প্রতিযোগিতা ইবনে বাওয়াব(মৃ.১০২২) নামে; ১৯৯৭ সালে ৪র্থ প্রতিযোগিতা শেখ হামদুল্লাহ(১৪২৯-১৫২০) নামে; ২০০০ সালে ৫ম প্রতিযোগিতা সাইয়েদ ইবরাহীম(১৮৯৭-১৯৯৪) নামে; ২০০৩ সালে ৬ষ্ঠ প্রতিযোগিতা মীর ইমাদ আল হাসানী(১৫৫৪-১৬১৫) নামে; ২০০৬ সালে ৭ম প্রতিযোগিতা ইরাকী ক্যালিগ্রাফার হাশিম মুহাম্মদ আল বাগদাদী(১৯১৭-১৯৭৩) নামে এবং ২০০৯ সালে ৮ম প্রতিযোগিতা সিরিয়ার ক্যালিগ্রাফার মুহাম্মদ বাদাবী আল দিরানী(১৮৯৪-১৯৬৭) নামে অনুষ্ঠিত হয়। প্রেস বিজ্ঞপ্তি।

আমিনুল ইসলাম আমিন
সেক্রেটারি
বাংলাদেশ ক্যালিগ্রাফি ফাউন্ডেশন
ঢাকা
৩ মে ২০১৩

Mohammad Abdur Rahim's Facebook page



IRCICA result sheet


Featured Post

Calligraphy Class started for Biggeners

I started new year Calligraphy Class. Today is 2nd class. Any person of no boundary on ages, can learn calligraphy, if he or she interes...